আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে উত্তাপ। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার দুপুরে মেহেরপুর সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় নতুন এক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কথা শোনালেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ঘোষণা করেছেন, ক্ষমতায় গেলে চাঁদাবাজদের কেবল পুনর্বাসন নয়, বরং তাদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে রাষ্ট্র।
মেহেরপুর জেলা জামায়াতের আয়োজনে এই নির্বাচনি জনসভাটি মূলত ১১ দল সমর্থিত ও জামায়াত মনোনীত দুই প্রার্থীর সমর্থনে আয়োজিত হয়। মেহেরপুর-১ আসনের প্রার্থী তাজ উদ্দিন খান এবং মেহেরপুর-২ আসনের প্রার্থী নাজমুল হুদার পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতেই জামায়াত আমির জেলাটিতে সফর করেন। তার আগমনকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে জনসভাস্থল জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
জনসভার প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান স্থানীয় প্রেক্ষাপট টেনে বলেন, মেহেরপুর ছোট জেলা হলেও এর বাণিজ্যিক ও সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ দুঃখজনকভাবে এই শান্তির জনপদও এখন চাঁদাবাজদের কবলে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা চাঁদাবাজদের প্রশ্রয় দেবো না। তবে তাদের অপরাধের পথে ঠেলে না দিয়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কাজের সুযোগ করে দেবো, যাতে তারা সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে।”
নির্বাচন প্রসঙ্গে তার বক্তব্যে ছিল কড়া হুঁশিয়ারি এবং কৌশলগত দিকনির্দেশনা। ভোটকে ‘আজাদি’ ও ‘গোলামি’র মধ্যকার লড়াই হিসেবে অভিহিত করে তিনি সমর্থকদের ভোটকেন্দ্র পাহারার নির্দেশ দেন। তার মতে, ভোট ডাকাতি রুখতে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধই হবে আগামী দিনের গণতন্ত্র রক্ষার মূল চাবিকাঠি। তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণ ইতোমধ্যে তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে এবং পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিতে প্রস্তুত।
বিগত ৫৪ বছরের শাসনের কঠোর সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, দীর্ঘ এই সময়ে দেশে প্রকৃত সামাজিক বিচার বা ‘ইনসাফ’ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এর ফলে তরুণ সমাজ আজ লক্ষ্যহীন হয়ে মাদক ও বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। তরুণদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, জামায়াত সুযোগ পেলে দেশকে একটি ‘ফুলের মতো’ সাজানো রাষ্ট্রে পরিণত করবে, যেখানে নাগরিকরা গর্ব নিয়ে বাঁচতে পারবে।
বেকারত্ব দূরীকরণ নিয়ে ডা. শফিকুর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বেশ ভিন্নধর্মী। তিনি সরাসরি ‘বেকার ভাতা’র বিরোধিতা করে বলেন, “রাষ্ট্রের টাকা থাকলেও আমরা বেকার ভাতা দেবো না। কারণ ভাতা দিলে মানুষের মধ্যে অলসতা তৈরি হয় এবং বেকারত্ব কমে না।” তার পরিবর্তে প্রতিটি বেকারের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করাকেই তিনি দলীয় অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন।
দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে তিনি বলেন, জামায়াত কেবল মুখে নীতি কথা বলে না, তা কাজেও প্রমাণ করতে চায়। তরুণদের শক্তির ওপর ভর করে একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। তার ভাষায়, যুব সমাজকে দাতা নয়, বরং কর্মশক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ডা. শফিকুর রহমান মেহেরপুরের দুটি আসনের প্রার্থীদের হাতে দলীয় নির্বাচনি প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ তুলে দেন। এসময় জনতা স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে তোলে পুরো ময়দান। তিনি উপস্থিত সকলের কাছে ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনে সহযোগিতা ও দোয়া প্রার্থনা করেন।
জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মোহাম্মদ তাজ উদ্দীন আহমেদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, জামায়াত আমিরের এই ‘কর্মসংস্থান ভিত্তিক’ বক্তব্য তরুণ ভোটারদের মধ্যে আলাদা গুরুত্ব তৈরি করতে পারে, যা আসন্ন নির্বাচনে মেহেরপুরের ভোটের সমীকরণে প্রভাব ফেলবে।

