বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার পুত্র ড. রেজা কিবরিয়া প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সাবেক কর্মকর্তা এবং একজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত রেজা কিবরিয়ার এই যোগদান বিএনপির রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরকে শক্তিশালী করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সোমবার (১ ডিসেম্বর) ঢাকার গুলশানে অবস্থিত বিএনপির চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে ড. কিবরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে ফুল দিয়ে বিএনপিতে যুক্ত হন। এই যোগদানের মাধ্যমে তিনি তার পুরনো রাজনৈতিক সংযোগগুলো ছিন্ন করে বিএনপির মূল ধারার রাজনীতির সঙ্গে একীভূত হলেন।
ড. রেজা কিবরিয়াকে স্বাগত জানাতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “আমরা অত্যন্ত গর্বিত যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত ড. রেজা কিবরিয়া বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। আমি আমাদের দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে তাকে আন্তরিক অভিনন্দন ও স্বাগত জানাই।”
মির্জা ফখরুল তার বক্তব্যে ড. কিবরিয়ার অভিজ্ঞতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ড. কিবরিয়া দেশের একজন অত্যন্ত বিশিষ্ট সন্তান, যিনি তার ব্যক্তিগত মেধা ও যোগ্যতা বলে আইএমএফ-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি দেশে ফিরে এসে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণফোরামের হয়ে তৎকালীন যুক্তফ্রন্টের অংশ হিসেবে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন এবং এরপর থেকে সক্রিয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখছেন।
বিএনপি মহাসচিব আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ড. রেজা কিবরিয়া তার ব্যাপক আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক জ্ঞান ব্যবহার করে বিএনপির ‘৩১ দফা’ কর্মসূচির আলোকে একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন এবং বিশেষত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতকে শক্তিশালী করতে অবদান রাখবেন।
বিএনপিতে যোগদানের পর ড. রেজা কিবরিয়া তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিতে যোগ দিতে পেরে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করছি। আমি আজকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দলটিতে যোগদান করলাম।”
ড. কিবরিয়া তার বক্তব্যে বিএনপির ঐতিহাসিক ভূমিকার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “এই দলটির ইতিহাস হলো গণতন্ত্রকে রক্ষার ইতিহাস। দুই-দুইবার তারা ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের কবল থেকে গণতন্ত্রকে রক্ষা করেছে।”
তিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন: ১. “একবার শেখ মুজিবুর রহমানের গণতন্ত্র ধ্বংসের পর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেই গণতন্ত্রকে রক্ষা করেছিলেন।” ২. “দ্বিতীয়বার শেখ হাসিনা-জেনারেল এরশাদের হাত ধরে গণতন্ত্র ধ্বংসের মুখে পড়লে আমাদের বেগম খালেদা জিয়া, যিনি এখন অনেক অসুস্থ—তাঁর জন্য সবাই দোয়া করবেন—তিনি আবার তা রক্ষা করলেন।”
ড. কিবরিয়া বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব এবং তাদের ভিশন নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী মনোভাব প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমরা মনে করি যে বিএনপি এখন যে নেতৃত্বে আছে এবং সিনিয়র নেতারা যারা আছেন, তারা আমাদের দেশের নতুন প্রজন্মের সব স্বপ্ন পূরণ করতে সক্ষম হবে। দেশের জন্য তাদের যে ভিশন, তা অতীতের ভিশন নয়, অনেক পরিবর্তিত।”
তিনি বিশেষভাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বের গুণাবলী ও বংশীয় ঐতিহ্যের ওপর আলোকপাত করেন। ড. কিবরিয়া মন্তব্য করেন, “আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রক্ত, এটা কী মানের, আপনারা যদি চিন্তা করেন—তাঁর পিতা কী ছিলেন এবং মা কী আছেন—এটি অবিশ্বাস্য (ইনক্রেডিবল)। বাংলাদেশে আর কারো সেই মানের বংশীয় ঐতিহ্য বা ‘ব্লাড লাইন’ নেই, আপনাদেরকে বলতে পারি।” তিনি আশ্বাস দেন, দেশের নতুন রূপরেখা গঠনে তারা সকলে তারেক রহমানকে সাহায্য করবেন।
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিদেশ অবস্থান প্রসঙ্গে ড. কিবরিয়া বলেন, “তিনি বিদেশে আছেন, এটা একদিকে দুঃখজনক যে দেশের মানুষের কাছে তিনি নেই। কিন্তু আরেক দিক থেকে আমি এতে খুশি যে, তিনি বিদেশে থাকার সুবাদে সব ধরনের গুণাবলী, সব প্রশাসনিক বিষয়গুলো দেখছেন ও শিখছেন এবং সেগুলো বাংলাদেশে আনবেন বলে আমি আশা করি। তাঁর ইংল্যান্ডে থাকা আসলে দেশের মানুষের জন্য একটা লাভজনক বিষয়। তিনি অনেক কিছু নিয়ে আসবেন এ দেশে যা আগে ছিল না।”
ড. রেজা কিবরিয়া তার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, “এই বাংলাদেশকে উন্নত করে এশিয়ার মধ্যে প্রথম তিনটি দেশের মধ্যে আনা অসম্ভব কিছু নয়। আপনারা হয়তো ভাবছেন, আমি কি রূপকথার মতো কথা বলছি। এটা পরে আপনারা দেখতে পাবেন। আমি প্রায় চল্লিশ বছর ধরে ৩৫টি দেশে কাজ করেছি। আপনাদেরকে বলতে পারি, আমাদের দেশের মানুষের মান বা ‘কোয়ালিটি’ হলো ‘শীর্ষ মানের (টপ ক্লাস)’ এবং এই মানুষগুলোকে দিয়েই একটা শীর্ষ সারির দেশ তৈরি করা সম্ভব হবে।”
তিনি ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিএনপিকে যদি এই সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে তারা দেশের জন্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী করতে পারে, তা জনগণ দেখবে।
ড. কিবরিয়া তার ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে বলেন, তিনি আশা করেন তার নির্বাচনী এলাকা হবিগঞ্জ-১ আসনে (বাহুবল-নবীনগর) কাজ করার একটি সুযোগ তিনি পাবেন। পাশাপাশি, যদি বিএনপি মনে করে তাকে জাতীয় পর্যায়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, তবে তিনি দেশের জন্য কাজ করতে প্রস্তুত।
যোগদান অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদসহ অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতারাও বক্তব্য রাখেন।
ড. কিবরিয়ার এই যোগদান তার রাজনৈতিক জীবনের ধারাবাহিকতা এবং আগামী নির্বাচনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। তিনি হবিগঞ্জ-১ আসন থেকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
উল্লেখ্য, বিএনপি তাদের আগামী সংসদ নির্বাচনের জন্য যে ২২৭টি আসনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে, সেখানে হবিগঞ্জ-১ আসনটি আপাতত ফাঁকা রাখা হয়েছে, যা ড. কিবরিয়ার জন্য এই আসনটি সংরক্ষিত রাখার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
ড. কিবরিয়ার রাজনৈতিক পথচলা অস্থির ছিল। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির জোটসঙ্গী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে একই আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন। এরপর তিনি গণফোরামে যোগ দিয়ে সাধারণ সম্পাদক হন এবং পরে তাকে কেন্দ্র করে দলটি বিভক্ত হয়ে পড়ে। এরপর তিনি ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের সঙ্গে গণঅধিকার পরিষদ গঠন করেন এবং সেখানে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সেখানেও বিভাজন সৃষ্টি হলে তিনি বিভক্ত অংশের ‘আমজনতার দলের’ প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘদিন বিভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করার পর অবশেষে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিতে তার এই আনুষ্ঠানিক প্রবেশকে দেশের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা আসন্ন নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।
