এক সময়ের শান্ত জনপদ পঞ্চগড় এখন নির্বাচনি উত্তাপে মুখর। হিমালয়ের পাদদেশের এই সীমান্ত জেলাটিতে আজ এক বিশাল জনসভায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর বঞ্চনার কথা তুলে ধরলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তার কণ্ঠে আজ শুধু রাজনীতির ভাষা ছিল না, ছিল উত্তরবঙ্গের অবহেলিত মানুষের দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি।
শুক্রবার দুপুরে পঞ্চগড় চিনিকল মাঠে আয়োজিত এক নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রতি রাষ্ট্রের বিমাতাসুলভ আচরণের কঠোর সমালোচনা করেন। ডা. শফিকুর রহমান সাফ জানিয়ে দিলেন, উত্তরবঙ্গ আদতে কোনো গরিব অঞ্চল নয়। বরং স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রতিটি সরকার এই জনপদকে সুপরিকল্পিতভাবে পিছিয়ে রেখেছে।
তিনি বলেন, যে অঞ্চল সারা দেশের মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেয়, পুষ্টির জোগান দেয়, সেই অঞ্চলের মানুষ কেন আজ অবহেলিত? তার প্রশ্ন ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। তিনি অভিযোগ করেন, গত কয়েক দশকে উত্তরবঙ্গকে কেবল দাতার ভূমিকায় রাখা হয়েছে, কিন্তু বিনিময়ে এই জনপদ পেয়েছে কেবল অবহেলা। অনেকটা সৎ মায়ের সন্তানের মতো এই জনপদের সঙ্গে আচরণ করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জনসভায় উপস্থিত বিশাল জনসমুদ্রের দিকে তাকিয়ে জামায়াত আমির এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখান। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, আগামী দিনে উত্তরবঙ্গ থেকে বেকারত্ব চিরতরে দূর করা হবে। তার ভাষায়, আমরা আর কোনো যুবক-যুবতীর করুণ মুখ দেখতে চাই না। প্রতিটি নাগরিককে মর্যাদার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিয়ে তাদের দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তিনি বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করার ঘোষণা দেন। চিনিকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক যে মানবেতর জীবন যাপন করছেন, তা তিনি সচক্ষে দেখেছেন বলে উল্লেখ করেন। ডা. শফিকুর রহমান প্রতিশ্রুতি দেন, বন্ধ মিলগুলো আবার সচল হবে এবং শ্রমিকরা তাদের কর্মস্থলে মাথা উঁচু করে ফিরে যাবেন।
রাজনৈতিক কৌশলের চেয়েও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দেন এই শীর্ষ নেতা। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আমাদের কাছে কোনো কৃত্রিম কার্ড নেই। এ দেশের সাধারণ মানুষই আমাদের আসল শক্তি, তারাই আমাদের পরিচয়। সাধারণ মানুষের ভালোবাসা আর দোয়ায় এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে কেউ কারো দয়ার পাত্র হয়ে থাকবে না।
বিগত দিনের সংকটকালীন মুহূর্তগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি দাবি করেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা কখনো দেশবাসীকে বিপদে ফেলে পালিয়ে যায়নি। সংকটের দিনে তারা মানুষের পাশেই ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার এই বক্তব্য উপস্থিত কর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে।
জনসভায় তিনি স্বাস্থ্যসেবা খাতের বেহাল দশা নিয়ে কথা বলেন। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের মানুষের উন্নত চিকিৎসার জন্য এখনো যে ঢাকামুখী হতে হয়, সেই বাস্তবতাকে তিনি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলে অভিহিত করেন। তিনি ঘোষণা দেন, জামায়াত সরকার গঠনের সুযোগ পেলে দেশের কোনো জেলা মেডিকেল কলেজবিহীন থাকবে না। বিশেষ করে পঞ্চগড়বাসীর দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হবে।
অর্থনৈতিক লুটপাটের প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে যারা দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করেছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। পাচার হওয়া প্রতিটি টাকা উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনা হবে। ভবিষ্যতে কাউকে আর দুর্নীতির মাধ্যমে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আন্দোলনে শহীদ হওয়া পরিবারগুলোর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগ আর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কাছে জামায়াত ঋণী। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ পেলে এই ঋণ শোধের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো হবে।
দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তার অবসানের জন্য তিনি সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত দেশে বৈষম্য, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও স্বৈরতন্ত্রের অবসান না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের ন্যায়বিচারের আন্দোলন চলতেই থাকবে। এই লড়াই কেবল ক্ষমতার জন্য নয়, বরং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই।
জনসভার শেষ পর্যায়ে তিনি পঞ্চগড়-১ আসনে ১০ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য সমর্থিত প্রার্থী সারজিস আলমের হাতে ‘শাপলা কলি’ প্রতীক এবং পঞ্চগড়-২ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী শফিকুল আলমের হাতে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক তুলে দেন। এই দুই প্রার্থীকে বিজয়ী করার মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের নতুন অধ্যায় শুরু করার জন্য তিনি পঞ্চগড়বাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
শীতের পড়ন্ত বিকেলে পঞ্চগড় চিনিকল মাঠ থেকে দেওয়া তার এই বক্তব্য উত্তরবঙ্গের মানুষের মনে নতুন করে আশার আলো জাগিয়েছে। উন্নয়ন আর অধিকারের দাবিতে সোচ্চার এই জনপদের মানুষ এখন কেবল সুন্দর আগামীর অপেক্ষায়।

