রংপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও আলোচনায় সেই চেনা মুখ আনোয়ারা ইসলাম রানী। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ (সদর ও সিটি কর্পোরেশন) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এবার তার নির্বাচনী যুদ্ধ হবে ‘হরিণ’ প্রতীকে। বুধবার দুপুরে রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ এনামুল আহসানের কাছ থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রতীক গ্রহণ করেন।
আনোয়ারা ইসলাম রানী কেবল একজন প্রার্থী নন, তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের এক পরিচিত যোদ্ধা। বর্তমানে তিনি ‘ন্যায় অধিকার ট্রান্সজেন্ডার উন্নয়ন সংস্থা’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের মর্যাদা ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি রাজপথে সক্রিয়। তার এই নির্বাচনী অংশগ্রহণ মূলত সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার আদায়ের এক প্রতীকী সংগ্রাম হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রংপুর-৩ আসনের লড়াইটা এবার বেশ জমজমাট। এই আসনে রানীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন হেভিওয়েট সব প্রার্থী। তাদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের (লাঙ্গল), বিএনপির শামসুজ্জামান সামু (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর অধ্যাপক মাহবুবার রহমান বেলাল (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমিরুজ্জামান পিয়াল (হাতপাখা) এবং বাসদের আব্দুল কুদ্দুস (মই)। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এসব প্রার্থীর মাঝেই নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান জানান দিচ্ছেন রানী।
প্রতীক পাওয়ার পর আবেগী কণ্ঠে রানী সাংবাদিকদের বলেন, “আমি কোনো ক্ষমতার মোহ বা রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে নির্বাচনে আসিনি। আমার শক্তির উৎস হলো মানুষের ভালোবাসা এবং ন্যায়ের পথ। আমি ক্ষমতা ভোগ করতে নয়, বরং যারা সমাজে কথা বলতে পারেন না, তাদের কণ্ঠস্বর হতে চাই।” তিনি আরও যোগ করেন, তার কোনো ব্যক্তিগত সংসার বা পিছুটান নেই, তাই জীবনের পুরোটা সময় তিনি সাধারণ মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করতে পারবেন।
রানী তার প্রতীকের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, হরিণ যেমন নিরীহ ও শান্ত, তেমনি সমাজের অবহেলিত মানুষেরাও শান্তিকামী। স্বাধীনতার দীর্ঘ পাঁচ দশকেও যারা প্রান্তিক রয়ে গেছেন, তাদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনাই তার মূল লক্ষ্য। সংসদে গিয়ে তিনি কেবল তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য নয়, বরং সব ধরনের বঞ্চিত মানুষের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে নির্বাচনের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এই লড়াকু প্রার্থী।
রংপুরের এই আসনে রানীর জনপ্রিয়তা একেবারে ফেলনা নয়। এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘ঈগল’ প্রতীক নিয়ে লড়েছিলেন। সে সময় তিনি জাতীয় পার্টির জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২৩ হাজার ৩৩৯ ভোট পেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে এবার আরও আত্মবিশ্বাসের সাথে ভোটের মাঠে নামতে সাহস জুগিয়েছে।
রংপুর সিটি কর্পোরেশনের ৯ থেকে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড এবং সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই নির্বাচনী এলাকা। এখানকার সাধারণ মানুষের মধ্যে রানীর প্রতি এক ধরনের কৌতূহল ও সহানুভূতি কাজ করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় কোন্দল এবং প্রার্থীদের মারপ্যাঁচে রানী যদি সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশের ভোট নিজের দিকে টানতে পারেন, তবে নির্বাচনের ফল চমকপ্রদ হতে পারে।
সমাজে পিছিয়ে থাকা এক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হয়ে বড় বড় রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে এই অসম লড়াইয়ে রানীর সাহসকে অনেকেই সাধুবাদ জানাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত ‘হরিণ’ প্রতীক নিয়ে রানী কতটা পথ পাড়ি দিতে পারেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

