কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে আবারো বাড়ছে উৎকণ্ঠা। এবার উখিয়া-৬৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের বিশেষ অভিযানে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উলুবনিয়া এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে স্থলমাইনের ১০টি প্রেশার প্লেট। মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নাফ নদী সংলগ্ন জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি এলাকায় চিরুনি অভিযান চালিয়ে এই ট্রিগার অংশগুলো উদ্ধার করা হয়।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) উখিয়া-৬৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, উদ্ধারকৃত প্লেটগুলোতে এই মুহূর্তে কোনো তাজা বিস্ফোরক না থাকলেও এগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম। বিশেষজ্ঞরা এগুলো পরীক্ষা করে দেখবেন যে এগুলোর কার্যকর ক্ষমতা কতটুকু। সীমান্তে যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ এবং চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবির টহল ও নজরদারি কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে।
সীমান্তবর্তী বাসিন্দারা এখন এক অদৃশ্য আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তীব্র সংঘাত চলছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে আরাকান আর্মি বাংলাদেশ সংলগ্ন প্রায় ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করার পর থেকেই ওই প্রান্তে জান্তা বাহিনীর উপস্থিতি কার্যত নেই। বিদ্রোহী দলগুলোর এই আধিপত্য লড়াইয়ের আঁচ এসে লাগছে বাংলাদেশের সীমানায়।
স্থানীয়দের মনে ভয় জাগাচ্ছে সাম্প্রতিক কয়েকটি রক্তক্ষয়ী ঘটনা। গত ১১ জানুয়ারি হোয়াইক্যং সীমান্তে ওপার থেকে ছোঁড়া গুলিতে ১২ বছর বয়সী শিশু হুজাইফা আফনান গুরুতর আহত হয়। সে বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। এর ঠিক একদিন পর, ১২ জানুয়ারি নাফ নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে স্থলমাইন বিস্ফোরণে পা হারান মোহাম্মদ হানিফ নামে এক যুবক। আজ উদ্ধার হওয়া প্রেশার প্লেটগুলো সেই আতঙ্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
সীমান্ত এলাকায় এখন সুনসান নীরবতা। নাফ নদীর তীরে যাদের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল, তারা এখন জীবনের মায়ায় জীবিকা ছেড়ে ঘরে বসে আছেন। স্থানীয় জেলে মোহাম্মদ মোতালেব বলেন, “আগে নদীতে মাছ ধরে সংসার চলত। এখন নদীতে নামতে জান যায়। কখন পায়ের নিচে মাইন ফাটে, তার কোনো ঠিক নেই। ওপার থেকে কখন গুলি আসবে সেই ভয়েই দিন কাটে।”
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজালাল জানিয়েছেন, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের তৎপরতা বাড়ালেও সাধারণ মানুষের মনের আতঙ্ক কাটছে না। তিনি বলেন, “সীমান্তে যে অস্থিরতা চলছে, তাতে স্থানীয়রা সবসময় উদ্বেগের মধ্যে থাকে। আমরা চাই সীমান্তে দ্রুত শান্তি ফিরুক এবং আমাদের জেলেরা যেন নির্ভয়ে কাজে ফিরতে পারে।”
সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী তাদের এলাকা রক্ষায় ব্যাপকভাবে ল্যান্ডমাইন বা স্থলমাইন ব্যবহার করছে। বর্ষা বা জোয়ারের পানিতে অনেক সময় এই মাইনগুলো ভেসে এপারে চলে আসে। উদ্ধার হওয়া প্রেশার প্লেটগুলো তারই অংশ হতে পারে। এ ধরনের প্রেশার প্লেট মূলত মাটির নিচে বা ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে রাখা হয়, যাতে ভারী কিছুর চাপ পড়লেই বিস্ফোরণ ঘটে।
বর্তমানে টেকনাফ ও উখিয়ার সীমান্তজুড়ে বিজিবির পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বৃদ্ধি করা হয়েছে। সন্দেহভাজন এলাকাগুলোতে নিয়মিত তল্লাশি চলছে। তবে ওপারের গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত টেকনাফ সীমান্তের এই অস্থিতিশীলতা পুরোপুরি কাটবে না বলেই আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

