গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসন্ন গণভোট ও সাধারণ নির্বাচনের পরিবেশ সুসংহত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। মঙ্গলবার বিকেলে বরগুনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি সাফ জানিয়ে দেন, “আমরা হ্যাঁ ভোটের জন্য কাউকে জোর করব না। এটি হবে মানুষের একান্ত স্বাধীন ইচ্ছা।”
বিকেল ৩টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপদেষ্টা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যে গণ-আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে দেশে পরিবর্তন এসেছে, সরকার সেই পরিবর্তনের ধারা বজায় রাখতেই গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে এই অবস্থান যেন জনমতের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে প্রশাসনকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তার বক্তব্যে স্বীকার করেন যে, গণভোটের বিষয়ে সরকার সরাসরি একটি ‘পক্ষ’। তিনি বলেন, “আমরা চাই হ্যাঁ জয়যুক্ত হোক, কারণ এটি পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। তবে সেই জয় আসতে হবে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে।” তিনি আরও যোগ করেন, সরকার হ্যাঁ ভোটের সুবিধাগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরবে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল সাধারণ মানুষের। “সুবিধাগুলো বলার পরেও যদি কেউ না ভোট দিতে চায়, তবে সে তাই দেবে। এখানে জবরদস্তির কোনো স্থান নেই।”
তৌহিদ হোসেন স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত ১৫-২০ বছর ধরে দেশের সব প্রজন্মের মানুষ একটি নির্দিষ্ট শাসনব্যবস্থার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের আত্মত্যাগের ফলে আজ সেই শিকল ভাঙার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের ছেলে-মেয়েরা জীবন দিয়ে যে সুযোগ তৈরি করেছে, তা আমাদের সব প্রজন্মকে একসূত্রে বেঁধে দিয়েছে। আমরা সবাই মুক্তি চেয়েছিলাম এবং এখন সেই মুক্তির স্বাদ স্থায়ী করার সময় এসেছে।”
নিজের প্রজন্মের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে এক বিরল সততার পরিচয় দেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “আমাদের জেনারেশন মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন করেছে, দেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ থেকে রক্ষা করেছে। কিন্তু আমাদের বড় ব্যর্থতা হলো—আমরা একটি সুষ্ঠু ও সংঘাতমুক্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি।”
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি যেখানে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে এবং এক সরকারের সঙ্গে অন্য সরকারের সুসম্পর্ক বজায় থাকবে। বর্তমান সময়কে সেই দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা মুছে ফেলার এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন তিনি। তার মতে, “আমাদের চেষ্টা করতে হবে যেন আমরা আর সেই পুরোনো দিনে ফিরে না যাই।”
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে মো. তৌহিদ হোসেন কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতার ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, “ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ থাকতেই পারে, কিন্তু তা কোনোভাবেই আপনার কর্মক্ষেত্রে প্রকাশ করা যাবে না। সরকার এই নির্বাচনে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। আপনাদের কোনো আচরণে যেন পক্ষপাতিত্বের লেশমাত্র না থাকে।”
তিনি হুশিয়ারি দেন যে, ভোট হবে সুষ্ঠু এবং গণনার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা বজায় রাখা হবে। মানুষ যাকে ভোট দেবে, তিনিই নির্বাচিত হবেন—এই সহজ সত্যটি নিশ্চিত করাই এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। তিনি সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা জনগণকে ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করেন এবং ১৭ বছরের শাসনব্যবস্থার চেয়েও উন্নত কোনো ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখান।
সভার সমাপনী বক্তব্যে উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ দেশ গড়াই এই অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য। তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের মানুষ জন্মগতভাবে ভোট দিতে পছন্দ করে এবং সুযোগ পেলে তারা সবসময় সঠিক সিদ্ধান্তই নেয়। এবারও সেই সুযোগটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর।
বরগুনার জেলা প্রশাসক মিস তাছলিমা আক্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও স্থানীয় সংবাদকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। সভার আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, সরকার গণভোটকে একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জনগণের আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখছে।

