চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কুখ্যাত ‘জঙ্গল সলিমপুর’ এলাকায় অভিযানে গিয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলার শিকার হয়েছেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সদস্যরা। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় এক র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে যখন খবর পাওয়া যায় যে, র্যাবের আরও তিন সদস্যকে গহীন পাহাড়ে আটকে রেখেছে দুর্বৃত্তরা।
সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, সন্ধ্যা সোয়া ৬টা পর্যন্ত র্যাবের অতিরিক্ত ফোর্স পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে এবং অপহৃত সদস্যদের উদ্ধারে শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান পরিচালনা করছে। জঙ্গল সলিমপুর—যা গত চার দশক ধরে অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত, সেখানে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর প্রবেশে এমন নগ্ন বাধা এই জনপদে নতুন কোনো ঘটনা নয়।
র্যাব-৭ পতেঙ্গা ব্যাটালিয়নের একটি দল সোমবার বিকেলে নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে জঙ্গল সলিমপুরের গহীনে প্রবেশ করে। প্রত্যক্ষদর্শী ও সূত্র জানায়, বাহিনীর গাড়ি পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছানো মাত্রই ‘পাহারাদার’ সন্ত্রাসীদের সংকেতে ওপর থেকে ইট-পাটকেল, ককটেল ও গুলি ছুড়তে শুরু করে দখলদাররা।
হামলায় এক র্যাব সদস্যের শরীর রক্তাক্ত হলে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে বিশৃঙ্খলার সুযোগে দুর্বৃত্তরা তিন র্যাব সদস্যকে বিচ্ছিন্ন করে জিম্মি করে ফেলে। সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, হামলার খবর পাওয়ামাত্রই জেলা পুলিশের বিপুল সংখ্যক সদস্য ঘটনাস্থলে পৌঁছে র্যাবকে সহযোগিতা করছে।
জঙ্গল সলিমপুর কেবল একটি দুর্গম এলাকা নয়, এটি মূলত একটি ‘বিপজ্জনক রাষ্ট্র’। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর আয়তনের এই সরকারি পাহাড়ি এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এখানকার প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত। সেই হিসাবে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি দখল করে আছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।
গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই দখলদারিত্বের নিয়ন্ত্রণ নিতে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাসে একাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হতে হয়েছে সাংবাদিকদেরও।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালানো এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাহাড়ের উচ্চতায় থাকা সন্ত্রাসীরা নিচ থেকে আসা যেকোনো গতিবিধি আগেভাগেই টের পেয়ে যায়। এর আগেও ২০২৩ এবং ২০২২ সালে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়ে অভিযান পণ্ড করে দিয়েছিল এই সশস্ত্র বাহিনীগুলো।
বর্তমানে পুরো জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় থমথমে উত্তেজনা বিরাজ করছে। র্যাবের হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে জিম্মি সদস্যদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। উল্লেখ্য, সরকার এই পাহাড়ি জমিতে কেন্দ্রীয় কারাগার ও আইটি পার্কসহ ১১টি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করলেও সন্ত্রাসীদের বাঁধার কারণে বছরের পর বছর ধরে সেই পরিকল্পনা ঝুলে আছে।

