উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের স্বপ্নের ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল চলতি জানুয়ারি মাসেই। তবে কারিগরি যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুরে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর এলাকায় তিস্তার ভাঙনপ্রবণ এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।
পরিদর্শনকালে উপদেষ্টার সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। মহাপরিকল্পনা নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া শঙ্কা দূর করে রিজওয়ানা হাসান বলেন, “প্রকল্পটি নিয়ে বাংলাদেশ ও চীন—উভয় সরকারই অত্যন্ত আন্তরিক। তবে যেহেতু এটি একটি বিশাল ও জটিল কর্মযজ্ঞ, তাই কোনো ভুল ছাড়াই কাজ সম্পন্ন করতে বিশেষজ্ঞরা সময় নিচ্ছেন। জানুয়ারির মধ্যে কাজ শুরু না হলেও এ নিয়ে হতাশ হওয়ার কিছু নেই।”
উপদেষ্টা ব্যাখ্যা করেন যে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেবল নদী খনন নয়; এর সঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, স্থায়ী নদী ভাঙন রোধ এবং বিস্তৃত সেচ কার্যক্রমের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো জড়িত। তিনি বলেন, “চীনের বিশেষজ্ঞরা আমাদের পাঠানো প্রস্তাবনাটি অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছেন। আমরা চাই কাজটি এমনভাবে হোক যেন ভবিষ্যতে কোনো ত্রুটি ধরা না পড়ে। ২৬ জানুয়ারির মধ্যে কাজ শুরু করার চেয়ে কাজটি নিখুঁতভাবে শুরু করাই আমাদের অগ্রাধিকার।”
রিজওয়ানা হাসান আরও জানান, চীন যত দ্রুত সম্ভব এই প্রকল্প শুরু করতে আগ্রহী। চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের গভীরতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিবেশী ও বন্ধু দেশ হিসেবে চীন এই অঞ্চলের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে। এমনকি তারা একটি বড় হাসপাতাল নির্মাণেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারেও তিস্তা ইস্যুটি গুরুত্ব পাচ্ছে। উপদেষ্টা বলেন, “এই সরকার প্রকল্পটি ফেলে রাখেনি এবং ভবিষ্যতেও যারাই ক্ষমতায় আসুক, তাদের অঙ্গীকারে এটি রয়েছে। তাই মহাপরিকল্পনার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল।” তিনি সতর্ক করে বলেন, সঠিক সমীক্ষা ছাড়া চুক্তিতে গেলে পরবর্তীতে অর্থায়ন বা নকশা পরিবর্তন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তাই উভয় দেশের জন্য সহনশীল ও জনগণের জন্য টেকসই হয়—এমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কাজ এগোচ্ছে।
তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার বিষয়ে উপদেষ্টা জানান, এটি একটি চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে তারা গঙ্গা ও তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক প্রস্তুতিগুলো গুছিয়ে রাখছেন, যাতে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এসেই কাজ শুরু করতে পারে।
পরিদর্শনকালে কাউনিয়া এলাকার তিস্তা সড়ক ও রেলসেতু সংলগ্ন এলাকা ঘুরে দেখেন উপদেষ্টা এবং চীনা রাষ্ট্রদূত। এ সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা নদীর বর্তমান গতি-প্রকৃতি ও সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। পরে তারা নৌকাযোগে নদীর বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।
উক্ত সফরে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান, রিভারাইন পিপলের পরিচালক ড. তুহিন ওয়াদুদ এবং ‘তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদে’র নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির এই প্রকল্প নিয়ে সরকারের এমন স্বচ্ছ অবস্থান স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে আশার আলো সঞ্চার করেছে।

