এক সময়ের ব্যস্ত ঢাকা-বরিশাল আকাশপথ এখন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। পর্যাপ্ত যাত্রী চাহিদা থাকার পরেও একের পর এক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এই রুটের নিয়মিত যাত্রীরা। এক সময় যেখানে প্রতিদিন অন্তত আটটি ফ্লাইট ওঠানামা করত, সেখানে এখন সপ্তাহে মাত্র দুই দিন ফ্লাইটের দেখা মিলছে। এতে করে জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত রাজধানীতে পৌঁছানোর সুযোগ হারিয়ে সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে সড়কপথের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর ভ্রমণে ফিরতে হচ্ছে।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) বরিশাল বিমানবন্দরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় যাত্রীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কেবল শুক্রবার ও রোববার দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে যে পরিমাণ যাত্রী রয়েছে, তার তুলনায় এই ফ্লাইট সংখ্যা নামমাত্র। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুম এবং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই রুটে আকাশপথের চাপ বাড়লেও ফ্লাইট বাড়ানোর কোনো লক্ষণ নেই।
বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সূত্র জানিয়েছে, মূলত এয়ারক্রাফট বা উড্ডয়নক্ষম উড়োজাহাজ সংকটের কারণেই এই অচলাবস্থা। আগে বৃহস্পতিবার একটি নিয়মিত ফ্লাইট চালু থাকলেও তা সম্প্রতি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করছে, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে আগামী ফেব্রুয়ারি নাগাদ বৃহস্পতিবারের ফ্লাইটটি পুনরায় চালু করা হতে পারে।
বরিশাল বিমানবন্দরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পদ্মা সেতু চালুর আগে এখানে এক ধরণের ‘এভিয়েশন বিপ্লব’ চলছিল। তখন ইউএস-বাংলা প্রতিদিন চারটি এবং বাংলাদেশ বিমান ও নভোএয়ার দুটি করে ফ্লাইট চালাত। কিন্তু পদ্মা সেতু চালুর পর সড়কপথ সহজ হওয়ায় যাত্রী কমে যাওয়ার অজুহাতে একে একে বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। প্রথমে নভোএয়ার এবং পরবর্তীতে ইউএস-বাংলা এই রুট থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়।
যদিও গত বছরের জুলাই মাসে সাময়িকভাবে ফ্লাইট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু পর্যটন নগরী কুয়াকাটা ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে আকাশপথের গুরুত্ব বিবেচনা করে ৮ আগস্ট থেকে আবারও সীমিত পরিসরে ফ্লাইট চালু হয়। বর্তমানে ৭৪ আসনের ‘ড্যাশ ৮-কিউ৪০০’ মডেলের ছোট উড়োজাহাজ দিয়ে কোনোমতে যোগাযোগ টিকিয়ে রাখা হয়েছে।
শফিকুল ইসলাম নামে একজন নিয়মিত যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের সময় ও কর্মঘণ্টার কোনো দাম নেই। আকাশপথে যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকার পরও আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যাম ঠেলে সড়কপথে যেতে হচ্ছে। লোকসানের কথা বলা হলেও আমরা তো টিকিট পাই না!” একই সুরে ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম বলেন, “ব্যবসায়িক কাজে আমাদের দ্রুত মুভমেন্ট দরকার হয়। লোকসানের অজুহাত দিয়ে একটি বিভাগীয় শহরের আকাশপথ বন্ধ রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
বিমানবন্দরে কর্মরত কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মাঝেমধ্যে প্রতিটি ফ্লাইটই শতভাগ যাত্রী নিয়ে উড্ডয়ন করে। বর্তমানে গড় যাত্রী সংখ্যা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ। তাদের মতে, ফ্লাইট সংখ্যা বাড়লে এবং সময়সূচি বা শিডিউল আকর্ষণীয় করা গেলে যাত্রীর সংখ্যা আরও বাড়বে। ট্রাভেলস এজেন্সিগুলোর পরামর্শ হলো, রোববার সকালে এবং বৃহস্পতিবার বিকেলে ফ্লাইট দিলে যাত্রী চাহিদা দ্বিগুণ হতে পারে।
বরিশাল বিমানবন্দর ব্যবস্থাপক সঞ্জয় কুমার বর্তমান পরিস্থিতির কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, যাত্রী সংখ্যা সন্তোষজনক এবং এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বিমানের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের দাবি, কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে ঢাকা-বরিশাল আকাশপথের আধুনিকায়ন ও নিয়মিত ফ্লাইট নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও পর্যটন সম্ভাবনা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।

