২০২৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে সরকার সব ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলায় নিজেদের দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান নীলফামারীতে এক সুধী সমাবেশে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যে কোনো বাধা আসুক না কেন, জনগণের ম্যান্ডেট রক্ষায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আপস করবে না।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) বিকেলে নীলফামারী জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি ভোটারদের ভবিষ্যতের নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার বিষয়ে এখন থেকেই চিন্তা-ভাবনা শুরু করার তাগিদ দেন। মূলত আসন্ন ‘হ্যাঁ-না’ গণভোটকে সামনে রেখে জনমত গঠন ও ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতেই এই সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের মেজাজ ছিল গম্ভীর কিন্তু আশাব্যঞ্জক, যেখানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়।
উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান তার বক্তব্যে দেশের বিদ্যমান আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন যে, পুরোনো ব্যবস্থা এবং একই ধরনের আইন-কানুন বজায় রেখে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব কি না। তার মতে, পরিবর্তনের এই যাত্রাকে টেকসই করতে সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করেছে, যা ইতোমধ্যে তাদের সুপারিশ জমা দিয়েছে।
বিশেষ করে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে কলুষমুক্ত করতে ছয়টি সংস্কার কমিশন নিবিড়ভাবে কাজ করেছে। এসব কমিশনের সুপারিশগুলো নিয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে সংলাপ পরিচালনা করা হয়েছে। উপদেষ্টা স্মরণ করিয়ে দেন যে, বর্তমান সরকার চিরস্থায়ী নয়; বরং একটি সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করে দিয়ে যাওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য। দেশকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত রাজনীতিবিদদেরই নিতে হবে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি আসন্ন গণভোটের ১২টি মূল পয়েন্ট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এই গণভোটটি মূলত রাষ্ট্র সংস্কারের মৌলিক বিষয়গুলোতে জনমতের প্রতিফলন ঘটাবে। রিজওয়ানা হাসান বলেন, “আমরা পরিবর্তনের পক্ষে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে এই ১২টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা চাইলে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ যে কোনোটি বেছে নিতে পারেন। তবে কেন আমাদের ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া প্রয়োজন, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা আমরা দিচ্ছি।”
তিনি অতীতের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলোপের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে রাজপথে অনেক রক্তের বিনিময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অর্জিত হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে রাজনৈতিক স্বার্থে তা সংবিধান থেকে মুছে ফেলা হয়। এর ফলে নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং একতরফা নির্বাচনের সংস্কৃতি চালু হয়।
উপদেষ্টার মতে, এবারের গণভোটে যদি জনগণ ‘হ্যাঁ’ সূচক রায় দেয়, তবে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো সরকার চাইলেই একক ইচ্ছায় সংবিধান পরিবর্তন করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। তিনি বিষয়টিকে একটি নিরাপদ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের ‘ভিত্তিপ্রস্তর’ হিসেবে অভিহিত করেন।
সভায় উপস্থিত স্থানীয়দের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, কোনো পরিবর্তনই রাতারাতি ঘটে না। কিন্তু একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা কায়েমের জন্য এই মুহূর্তে সাহসী সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। তিনি নীলফামারীবাসীকে আগামী নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থী বাছাই এবং সংস্কার প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের যুগ্ম সচিব মো. আবু জাফর এবং নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান জামান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারা স্থানীয় পর্যায়ে ভোটারদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রশাসনের গৃহীত পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের এই সফর এবং বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, সরকার সংস্কার প্রশ্নে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখাতে নারাজ। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর জনমত যাচাইয়ের এই প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারে। নীলফামারীর এই সভাটি কেবল একটি সরকারি প্রচার অনুষ্ঠান ছিল না, বরং এটি ছিল জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সরাসরি সংযোগ স্থাপনের একটি প্রয়াস।
সবশেষে, উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান তার আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে, বাংলাদেশের মানুষ সবসময়ই গণতন্ত্রের পক্ষে রায় দিয়েছে। এবারও তারা দেশের সার্বভৌমত্ব এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। সভাটি শেষ হয় ভোটারদের মধ্যে এক ধরণের নতুন উৎসাহের মধ্য দিয়ে, যা আগামী দিনের নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

