বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা হলো। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) একজন প্রভাবশালী পরিচালকের করা অবমাননাকর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত বিপিএল স্থগিতের দিকেই গড়াল। বিসিবি ও ক্রিকেটারদের মধ্যকার সমঝোতা ব্যর্থ হওয়ায় এবং ক্রিকেটাররা তাদের ধর্মঘটের সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় ত্রয়োদশ বিপিএল আসরটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি।
আজ বৃহস্পতিবার রাতেই সব ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেবে বিপিএল টেকনিক্যাল কমিটি। বোর্ডের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গতকাল বুধবার, যখন বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কিছু বিতর্কিত ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। এর পরপরই ক্রিকেটারদের সংগঠন ‘কোয়াব’ (COAB) তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে নাজমুলের পদত্যাগ দাবি করে এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের ক্রিকেটীয় কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আজ দুপুরে বিসিবি নাজমুলকে অর্থ কমিটির চেয়ারম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি দিলেও ক্রিকেটাররা তাতে সন্তুষ্ট হননি। তাদের দাবি ছিল— কেবল পদ থেকে সরানো নয়, বরং এমন আচরণের জন্য দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা।
আজ থেকে বিপিএলের ঢাকা পর্বের খেলা শুরু হওয়ার কথা ছিল। মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দিনের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল চট্টগ্রাম রয়্যালস ও নোয়াখালী এক্সপ্রেসের। দুপুর সাড়ে ১২টায় টসের নির্ধারিত সময় থাকলেও কোনো দলের ক্রিকেটারই ড্রেসিংরুম থেকে বের হননি, এমনকি তারা টিম হোটেল থেকেও মাঠে আসেননি।
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল এবং টেকনিক্যাল কমিটির আহ্বায়ক রাকিবুল হাসানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মিরপুরে উপস্থিত হয়ে ক্রিকেটারদের মাঠে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
মাঠে খেলা না গড়ানোয় গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো দর্শক চরম বিভ্রান্তি ও হতাশায় পড়েন। এক পর্যায়ে দর্শকদের আশ্বস্ত করতে স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে বিসিবির পক্ষ থেকে একটি দুঃখপ্রকাশ বার্তা প্রচার করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘অনিবার্য কারণবশত ম্যাচটি বিলম্বিত হচ্ছে এবং দ্রুত শুরু করার চেষ্টা চলছে।’
কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর দর্শকদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে এবং গ্যালারিতে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হিমশিম খেতে হয়। শেষ পর্যন্ত যখন বনানীর একটি হোটেলে ক্রিকেটাররা সংবাদ সম্মেলন করে তাদের ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন, তখন বিসিবি মাঠের সব প্রস্তুতি বন্ধ করে দেয় এবং দর্শকরা ক্ষোভ নিয়ে স্টেডিয়াম ত্যাগ করেন।
ক্রিকেটারদের এই অনড় অবস্থানের ফলে বিপিএলের আজকের দুটি ম্যাচই পণ্ড হয়ে গেছে। ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকরা এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে, সাধারণ দর্শকরা যারা চড়া মূল্যে টিকিট কেটে খেলা দেখতে এসেছিলেন, তাদের টিকিটের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে কি না— সে বিষয়ে বিসিবি এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেয়নি। এই অনিশ্চয়তা টুর্নামেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, একজন কর্মকর্তার অবিবেচক মন্তব্য এবং বোর্ডের ধীরগতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতিই এই সংকটের প্রধান কারণ। বিপিএলের মতো একটি আন্তর্জাতিক মানের টুর্নামেন্ট এভাবে মাঝপথে থমকে যাওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তিকে বিশ্বদরবারে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিদেশি ক্রিকেটার ও কোচরা যারা এই আসরে অংশ নিতে এসেছেন, তারাও এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।
বিসিবি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে সরকার ও বোর্ডের উচ্চপর্যায় থেকে মধ্যস্থতার চেষ্টা চলছে। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত ক্রিকেটাররা তাদের সম্মান ও দাবির স্বপক্ষে সুনির্দিষ্ট আশ্বাস না পাচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত বিপিএল পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আজ রাতের মধ্যে বিসিবি একটি বিস্তারিত বিবৃতির মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ এবং স্থগিতাদেশের মেয়াদ সম্পর্কে দেশবাসীকে অবহিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
