বাংলাদেশের সংবিধানে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিতের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। বিশেষ করে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই ব্যবধান প্রকট। নোয়াখালী জেলার চিত্রটিও এর ব্যতিক্রম নয়। জেলায় আনুমানিক দুই হাজারেরও বেশি হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করলেও সরকারি ভোটার তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্তির হার হতাশাজনক।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলার ৯টি উপজেলায় বিস্তৃত বিশাল এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র ১৪ জন ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নোয়াখালী-২ ও নোয়াখালী-৫ সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলায় একজন হিজড়াও এখন পর্যন্ত ভোটার তালিকায় স্থান পাননি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিবরণী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নোয়াখালীর ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটারের সংখ্যা ২৮ লাখ ৬৭ হাজার ৬৪১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১৪ লাখ ৯৬ হাজার ৬৪৮ এবং নারী ভোটারের সংখ্যা ১৩ লাখ ৭০ হাজার ৬৭৯ জন। বিপরীতে, তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধি হিসেবে মাত্র ১৪ জন ভোটারের নাম তালিকায় রয়েছে।
আসনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নোয়াখালী-১ আসনে ১ জন, নোয়াখালী-২ আসনে ১ জন, নোয়াখালী-৩ আসনে সর্বোচ্চ ৮ জন, নোয়াখালী-৪ আসনে ৩ জন এবং নোয়াখালী-৬ আসনে ২ জন ভোটার নিবন্ধিত। তবে নোয়াখালী-৫ আসনে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারের সংখ্যা শূন্য। মূলত কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট ও সেনবাগ—এই তিন উপজেলায় হিজড়া জনগোষ্ঠীর বিশাল বসতি থাকলেও তারা তাদের নাগরিক ও সাংবিধানিক ভোটাধিকার থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন।
মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে এই করুণ পরিস্থিতির নেপথ্যে বেশ কিছু দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা উঠে এসেছে। যদিও নির্বাচন কমিশন ভোটার নিবন্ধন ফরমে হিজড়াদের জন্য স্বতন্ত্র ক্যাটাগরি চালু করেছে এবং তাদের স্বেচ্ছায় নারী বা পুরুষ হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার সুযোগও রেখেছে, কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ের এই মানুষগুলো সেই সুযোগ সম্পর্কে খুব একটা অবগত নন। সামাজিক অবজ্ঞা এবং পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছেদ হওয়ার ফলে অনেকের কাছেই প্রয়োজনীয় দলিলাদি যেমন—পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদ নেই। এই কাগজের সংকটের কারণে তারা নির্বাচন অফিসে যেতে ভয় পান অথবা নিবন্ধিত হতে ব্যর্থ হন।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা লাকী হিজড়া আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন যে, কেবল তাদের এলাকাতেই দুই শতাধিক হিজড়া বসবাস করেন যারা দীর্ঘ সময় ধরে এখানে থাকলেও তাদের কারো নাম ভোটার তালিকায় ওঠেনি। যথাযথ কাগজপত্রের অভাব এবং কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের জটিলতা তাদের মূলধারার সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।
একইভাবে হিজড়া সম্প্রদায়ের স্থানীয় প্রতিনিধি ‘গুরু মা’ আলো হিজড়া জানান, তাদের মতো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা মানে তাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। তার মতে, রাষ্ট্র যদি সহজ ও মানবিক প্রক্রিয়ায় তাদের নিবন্ধন নিশ্চিত না করে, তবে তারা আজীবন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত থেকে যাবেন।
এদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এই সংকটের এক ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান জানান, মাঠ পর্যায়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার সময় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের তেমন উপস্থিতি পাওয়া যায় না এবং ব্যক্তিগতভাবেও কেউ ভোটার হতে আসেননি। তবে তিনি আশ্বাস দেন যে, কেউ ভোটার হতে চাইলে নির্বাচন অফিস সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানে প্রস্তুত।
নোয়াখালীর সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাদেকুল ইসলামও একই সুরে কথা বলেন। তিনি জানান, তারা ইতিমধ্যে বেগমগঞ্জসহ কিছু এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করেছেন। হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষকে ভোটাধিকারের গুরুত্ব বোঝাতে উঠান বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে। প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন তাদের নিরাপত্তা এবং ভোটকেন্দ্রে সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।
বিশ্লেষকদের মতে, কেবল ফরমে আলাদা ক্যাটাগরি যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়, বরং এই জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে হলে বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ বা প্রচারণার প্রয়োজন। যেহেতু তারা সামাজিকভাবে একঘরে থাকে, তাই তাদের ডেরায় গিয়ে ভোটার করার উদ্যোগ না নিলে এই সংখ্যার খুব একটা পরিবর্তন হবে না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নোয়াখালীর এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে ভোটের আওতায় আনা কেবল একটি সাংবিধানিক দায়িত্বই নয়, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসন যদি সময়মতো উদ্যোগী হয়, তবে হয়তো আগামীর নির্বাচনে নোয়াখালীর এই অবহেলিত মানুষগুলোও তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
