দক্ষিণ এশীয় ফুটবল অঙ্গনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে প্রথমবারের মতো আয়োজিত হয়েছে ‘সাফ ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপ’। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী দিনেই ক্রীড়াপ্রেমীরা সাক্ষী হলেন এক রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের। টুর্নামেন্টের অন্যতম দুই শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল এক মর্যাদার লড়াইয়ে।
মাঠের লড়াইয়ে কেউ কাউকে এক চুল পরিমাণ ছাড় না দিলেও, শেষ পর্যন্ত ৪-৪ গোলের সমতায় শেষ হয়েছে এই উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচটি। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক ও ক্রিকেটীয় উত্তাপ যখন তুঙ্গে, তখন ফুটসালের এই ড্র মাঠের লড়াইয়ে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে।
ব্যাংককের ইনডোর স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে দুই দলই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। ফুটসালের সংক্ষিপ্ত ও গতিশীল এই ফরম্যাটে খেলোয়াড়দের চতুরতা এবং ক্ষিপ্রতা ছিল দেখার মতো। প্রথমার্ধে বাংলাদেশ দল অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে ভারতের রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করে।
ম্যাচের মাত্র নবম মিনিটেই সফলতার মুখ দেখে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। স্ট্রাইকার মঈন আহমেদের চমৎকার ফিনিশিংয়ে বাংলাদেশ প্রথম লিড অর্জন করে। তবে ভারতের পাল্টা আক্রমণের ধারও ছিল প্রবল। গোল হজম করার মাত্র তিন মিনিটের মাথায় সমতায় ফেরে ভারতীয় শিবির।
বাংলাদেশ দল দমে না গিয়ে লড়াই চালিয়ে যায় এবং ম্যাচের ১৬তম মিনিটে আবারও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। দলের অভিজ্ঞ অধিনায়ক রাহবার খান এক অসাধারণ শটে বল জালে জড়িয়ে বাংলাদেশকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। গ্যালারিতে থাকা দর্শকদের উল্লাস যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে ভারত আবারও গোল করে ম্যাচে ২-২ সমতা ফিরিয়ে আনে। ফলে সমতায় থেকেই বিরতিতে যায় দুই দল। বিরতির আগে গোল হজম করা বাংলাদেশের রক্ষণভাগের জন্য কিছুটা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে দৃশ্যপট কিছুটা পরিবর্তিত হয়। এবার ভারত আক্রমণের ধার বাড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশের রক্ষণের পরীক্ষা নিতে থাকে। ম্যাচের ২৭তম মিনিটে প্রথমবারের মতো লিড পায় ভারত। পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ কিছুটা ব্যাকফুটে চলে গেলেও মঈন আহমেদের নৈপুণ্যে আবারও ম্যাচে ফেরে দল। ম্যাচের ৩১তম মিনিটে ভারতীয় গোলরক্ষকের পায়ের নিচ দিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠিয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন মঈন। এতে করে ৩-৩ সমতায় ফেরে বাংলাদেশ।
ম্যাচের ভাগ্য যখন দোদুল্যমান, তখন ৩৬তম মিনিটে ভারত চতুর্থ গোলটি করে জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। গ্যালারিতে তখন ভারতীয় সমর্থকদের উচ্ছ্বাস। ৪-৩ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশের জন্য হাতে সময় ছিল খুবই কম। তবে অধিনায়ক রাহবার খান চাপের মুখে নিজের সামর্থ্যের পরিচয় দেন। ভারতের একজন ডিফেন্ডারের কাছ থেকে বল ছিনিয়ে নিয়ে দুর্দান্ত এক জোরালো শটে তিনি বল জালে জড়ান।
রাহবার খানের এই জোড়া গোলে ম্যাচে ৪-৪ সমতা ফিরে আসে। ম্যাচের শেষ তিন মিনিট ছিল চরম উত্তেজনার। দুই দলই জয়সূচক গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ভারতের খেলোয়াড়রা বাংলাদেশের গোলরক্ষককে একা পেয়েও লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হন। অন্যদিকে, ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের ফরোয়ার্ডের নেওয়া একটি জোরালো শট ভারতের গোলরক্ষককে পরাস্ত করলেও গোলপোস্টের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেলে নিশ্চিত জয় বঞ্চিত হয় বাংলাদেশ।
এই ম্যাচটিকে ঘিরে মাঠের বাইরেও ছিল ব্যাপক উৎসাহ। বিশেষ করে বাংলাদেশের নারী জাতীয় ফুটবল দলের সদস্যরা, যারা বর্তমানে নারী ফুটসালে অংশ নিতে ব্যাংককে অবস্থান করছেন, তারা গ্যালারিতে উপস্থিত থেকে রাহবার-মঈনদের অকুণ্ঠ সমর্থন যুগিয়েছেন।
সাবিনা খাতুন ও মাসুরা পারভীনদের এই উপস্থিতি দলের মনোবল বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। উল্লেখ্য যে, আগামীকাল নারী ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বাংলাদেশ ভারতের মুখোমুখি হবে। দুই দেশের ক্রীড়া লড়াই এখন ফুটসালের ইনডোর কোর্টেও ছড়িয়ে পড়েছে, যা দক্ষিণ এশীয় ফুটবলের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে।
সাফ ফুটসালের এই আসরে দক্ষিণ এশিয়ার মোট ছয়টি দেশ অংশগ্রহণ করছে। টুর্নামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী, রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতিতে প্রতিটি দল পাঁচটি করে ম্যাচ খেলবে এবং পয়েন্ট তালিকায় শীর্ষে থাকা দলটিই চ্যাম্পিয়নের মুকুট অর্জন করবে।
ভারতের বিপক্ষে এই ড্রয়ের ফলে বাংলাদেশ এক পয়েন্ট সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও জয়ের খুব কাছে গিয়েও ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে, তবুও শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের এমন লড়াকু পারফরম্যান্স সমর্থকদের মনে আশার আলো জাগিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেটে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যেকার অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক সূচি নিয়ে নানা বিতর্কের প্রেক্ষাপটে এই ম্যাচটি ছিল অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। আইপিএল ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে চলমান আলোচনার মাঝে ফুটবল মাঠের এই লড়াই প্রমাণ করেছে যে, খেলোয়াড়ি চেতনায় মাঠের লড়াই সবসময়ই স্বতন্ত্র।
ব্যাংককের এই রোমাঞ্চকর ম্যাচটি কেবল একটি ড্র নয়, বরং দুই দেশের ফুটবল শক্তির সমান্তরাল অবস্থানের একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরেছে। এখন দেখার বিষয়, টুর্নামেন্টের পরবর্তী ম্যাচগুলোতে বাংলাদেশ তাদের এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কতদূর যেতে পারে।
আগামীকালের নারী দলের লড়াই এখন ফুটবল প্রেমীদের মূল আকর্ষণ। পুরুষ দলের এই বীরত্বপূর্ণ ড্র নারী দলকে কতটা অনুপ্রাণিত করে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে প্রথম আসরেই সাফ ফুটসাল যে দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছে, ব্যাংককের এই ম্যাচটিই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বাংলাদেশের ফুটসাল ইতিহাসে এই দিনটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে এক দুর্দান্ত কামব্যাক এবং লড়াকু মানসিকতার জন্য।
