চরম অর্থনৈতিক সংকট থেকে সৃষ্ট গণ-অসন্তোষে উত্তাল ইরানে প্রাণহানির সংখ্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে ২ হাজার বলে স্বীকার করেছে দেশটির একজন সরকারি কর্মকর্তা। মঙ্গলবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই তথ্য নিশ্চিত করেন। গত ২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এটিই প্রথম এবং সবচেয়ে বড় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
ওই সরকারি কর্মকর্তা জানান, নিহতদের মধ্যে যেমন সাধারণ নাগরিক রয়েছেন, তেমনি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও আছেন। তবে তিনি এই বিপুল প্রাণহানির জন্য সরাসরি বিক্ষোভকারীদের দায়ী না করে অজ্ঞাত ‘সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করেছেন। ইরানের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি দাবি করেন, অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সাধারণ মানুষের মিছিলে সহিংসতা উসকে দিচ্ছে।
২০২৫ সালের শেষদিকে ইরানি মুদ্রার (রিয়াল) নজিরবিহীন দরপতন এবং আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। যা খুব দ্রুতই রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয় এবং দেশটির ৩১টি প্রদেশের ১৮০টিরও বেশি শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে বর্তমান ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্য এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ।
বিক্ষোভকারীরা কেবল অর্থনৈতিক সংস্কার নয়, বরং বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিকে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ‘ইরানের নতুন বিপ্লব’ হিসেবেও আখ্যায়িত করছেন।
বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। গত ৮ জানুয়ারি থেকে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা এবং আন্তর্জাতিক টেলিফোন সংযোগ প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট যেন কাজ করতে না পারে, সেজন্য সামরিক গ্রেডের জ্যামার ব্যবহারের খবরও পাওয়া গেছে।
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সুযোগে নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি তাজা গুলি ছুড়ে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। রয়টার্স কর্তৃক যাচাইকৃত বেশ কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, রাতের অন্ধকারে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করছে এবং বিভিন্ন ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৪৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করতে পেরেছে, যার মধ্যে ৯ জন শিশু রয়েছে। তবে ইন্টারনেটের অনুপস্থিতিতে প্রকৃত সংখ্যাটি আরও কয়েক গুণ বেশি হতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
ইরানের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে বিশ্ব সম্প্রদায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং প্রয়োজনে সামরিক হস্তক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এই বিক্ষোভের পেছনে মদত দিচ্ছে বলে পাল্টা অভিযোগ করেছে তেহরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, তাঁরা কোনো যুদ্ধ চান না এবং পরিস্থিতি বর্তমানে ‘নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে। তবে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দেশের সার্বভৌমত্বে কোনো আঘাত এলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
বিপর্যস্ত অর্থনীতি এবং জনগণের তীব্র ক্ষোভের মুখে ইরানের শাসকগোষ্ঠী এখন একদিকে সংলাপের প্রস্তাব দিচ্ছে, অন্যদিকে রাজপথে কঠোর সামরিক শক্তি প্রয়োগ করছে। এই দ্বিমুখী কৌশল শেষ পর্যন্ত ইরানকে কোন পথে নিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
