১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লব ইরানের ইতিহাসে এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে দেশটিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা। তবে এই বিপ্লব-পরবর্তী সাড়ে চার দশকের পথচলা ইরানের জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। যুদ্ধ, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং একের পর এক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে বারবার কেঁপে উঠেছে দেশটি। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ইরানের সেই উত্তাল সময়গুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখানে তুলে ধরা হলো।
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে দীর্ঘ ১৪ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। তার নেতৃত্বে সফল বিপ্লবের পর এপ্রিল মাসে গণভোটের মাধ্যমে ইরানকে ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করা হয়। তবে নভেম্বর মাসে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকট শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে এবং ওয়াশিংটন ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যদিও ১৯৮১ সালে আলজিয়ার্স চুক্তির মাধ্যমে জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হয়, ততদিনে দুই দেশের শত্রুতা স্থায়ী রূপ নেয়।
১৯৮০ সালে প্রতিবেশী ইরাক ইরান আক্রমণ করলে শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। আট বছর স্থায়ী এই যুদ্ধে প্রায় ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারান, যার সিংহভাগই ছিল ইরানি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরিখা ও রাসায়নিক অস্ত্রের এমন ভয়াবহ ব্যবহার আর দেখা যায়নি।
যুদ্ধের মধ্যেই ১৯৮১ সালে তেহরানে বড় ধরনের দুটি বোমা হামলায় ইরানের শাসনব্যবস্থার ভিত নড়ে যায়। জুনে ইসলামিক রিপাবলিকান পার্টির সদর দপ্তরে হামলায় বিচার বিভাগীয় প্রধান মোহাম্মদ বেহেস্তিসহ কয়েক ডজন নেতা নিহত হন। এর মাত্র দুই মাস পর আগস্টে এক বোমা হামলায় প্রাণ হারান তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী রাজাই এবং প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ বাহানোর।
১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হলে ইরান সেখানে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়। তাদের সরাসরি সহায়তায় জন্ম নেয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘হিজবুল্লাহ’। ১৯৮৮ সালে যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির শিকার হয় ইরান। পারস্য উপসাগরে মার্কিন মিসাইল ক্রুজার ‘ইউএসএস ভিনসেনেস’ ভুলবশত ইরানের একটি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করলে ২৯০ জন আরোহীর সবাই নিহত হন। একই বছর জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ইরান।
১৯৮৯ সালের ৩ জুন বিপ্লবের নায়ক আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুতে ইরান শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। এরপর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশটির ‘সুপ্রিম লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ শুরু হয়।
১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল ও বাণিজ্যের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০০২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে ‘অশুভ অক্ষ’ (Axis of Evil) হিসেবে অভিহিত করলে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক চাপে ইরান সাময়িকভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করলেও ২০০৬ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ দেশটির পারমাণবিক প্রযুক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ‘আরব বসন্ত’ শুরু হলে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। মিত্র বাশার আল-আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ইরান তাদের চৌকস ‘বিপ্লবী গার্ড’ সেনাদের সিরিয়ায় পাঠায়। এই সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। ২০১২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের তেল বয়কট করলে দেশটির মুদ্রা ‘রিয়াল’-এর রেকর্ড দরপতন ঘটে।
দীর্ঘ এক দশকের আলোচনার পর ২০১৫ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনের সময় পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইরান ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তিতে সই করে। এর বদলে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে এককভাবে চুক্তিটি বাতিল করেন এবং ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করে চরম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হলে দুই দেশ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। এরপর ২০২২ সালে হিজাব নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুতে ইরানজুড়ে নজিরবিহীন বিক্ষোভ শুরু হয়। কয়েক মাস স্থায়ী এই গণআন্দোলন দমনে সরকারের কঠোর অবস্থানে অন্তত ৫০০ মানুষ প্রাণ হারান।
২০২৪ সালটি ইরানের জন্য ছিল অত্যন্ত শোকাবহ ও উত্তেজনাকর। মে মাসে এক রহস্যময় হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির-আব্দুল্লাহিয়ান নিহত হন। এর আগে এপ্রিলে সিরিয়ায় ইরানি দূতাবাসে ইসরায়েলি বিমান হামলায় দুই জেনারেল নিহত হলে ইরান সরাসরি ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তবে সবচাইতে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় ২০২৫ সালের জুনে। দখলদার ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সরাসরি যুদ্ধ বাধে যা ১২ দিন স্থায়ী হয়। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৬১০ জন ইরানি প্রাণ হারান।
বিপ্লব থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইরানের এই পথচলা মূলত অভ্যন্তরীণ স্থায়িত্ব রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক চাপের বিরুদ্ধে টিকে থাকার এক দীর্ঘ লড়াই। বর্তমানে দেশটি এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অর্থনৈতিক সংকট ও বাহ্যিক সামরিক হুমকি পারস্যের এই জনপদকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে।
