অস্ট্রেলিয়ার বাঁহাতি ব্যাটার নিক ম্যাডিনসনের কাছে ক্রিকেট এখন আর কেবল একটি পেশা কিংবা নিছক বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি এখন তার কাছে নতুন করে বেঁচে থাকার সার্থকতা এবং আনন্দের প্রতীক। প্রাণঘাতী ‘টেস্টিকুলার ক্যান্সার’ বা অণ্ডকোষের ক্যান্সারের সাথে দীর্ঘ এক যন্ত্রণাদায়ক লড়াই শেষে আবার ক্রিকেটের চিরচেনা আঙিনায় ফিরেছেন তিনি। এই প্রত্যাবর্তন ম্যাডিনসনকে শিখিয়েছে যে, স্কোরবোর্ডে রানের চেয়েও জীবনের মাঠে টিকে থাকাটা কতটা জরুরি।
গত অফ-সিজনে যখন শরীরিক পরীক্ষার পর তার ক্যান্সার ধরা পড়ে, তখন পুরো পৃথিবীটা যেন থমকে গিয়েছিল এই অজি তারকার। সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া হিসেবে তাকে টানা নয় সপ্তাহ অসহ্য যন্ত্রণার ‘কেমোথেরাপি’ নিতে হয়। সেই দিনগুলোতে ক্রিকেট তো দূরের কথা, স্বাভাবিক জীবনযাপন করাই তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কেমোথেরাপির প্রভাবে শরীর এতটাই নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল যে, বিছানা থেকে উঠে পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।
ম্যাডিনসনের কাছে চিকিৎসার সেই দিনগুলোর সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতি ছিল তার আড়াই বছর বয়সী শিশুপুত্রকে সময় দিতে না পারা। শরীর চরম দুর্বল হয়ে পড়ায় নিজের সন্তানকে কোলে নেওয়া কিংবা তাকে পার্কে নিয়ে গিয়ে খেলাধুলা করার মতো সাধারণ কাজগুলোও তার কাছে তখন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ মনে হতো। ক্যান্সারের সেই দুঃসহ দিনগুলো তাকে জীবনের নশ্বরতা ও ছোট ছোট সুখের গুরুত্ব নতুন করে চিনিয়েছে।
কঠিন চিকিৎসা প্রক্রিয়া শেষে অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেন ম্যাডিনসন। প্রথমে স্থানীয় গ্রেড ক্রিকেটের মাধ্যমে নিজেকে ঝালিয়ে নেওয়ার পর চলতি বিগ ব্যাশ লিগে সিডনি থান্ডারের জার্সিতে তার রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটে। মেলবোর্ন রেনেগেডসের বিপক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অপরাজিত ৩০ রান করে দলকে জয় উপহার দেন তিনি। মাঠ ছাড়ার সময় তার মুখে যে তৃপ্তির হাসি দেখা গিয়েছিল, তা ছিল ছয় মাস আগের অনিশ্চিত এক স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার আনন্দ।
বর্তমানে ৩৪ বছর বয়সী এই ব্যাটার খুব ভালো করেই জানেন যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলে পুনরায় ডাক পাওয়াটা হয়তো অনেক কঠিন হবে। তবে সেই প্রত্যাশা বা চাপ এখন আর তাকে স্পর্শ করে না। ম্যাডিনসনের ভাষায়, “এখন আমার কাছে মূল প্রাপ্তি হলো কোনো মানসিক চাপ ছাড়াই ক্রিকেট উপভোগ করা। আমি কত বছর আরও খেলতে পারব, সেই হিসাব এখন আর মেলাতে চাই না। যতদিন মাঠের এই লড়াইটা ভালো লাগবে, ততদিনই খেলে যাব।”
ম্যাডিনসনের এই অন্ধকার সময়ে তার পাশে ছায়ার মতো ছিলেন শৈশবের বন্ধুরা। বিশেষ করে অজি স্পিনার অ্যাডাম জাম্পার সমর্থন তাকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেয়নি। কেমোথেরাপি শেষ হওয়ার পরপরই তিনি পরিবার নিয়ে জাম্পার বাড়িতে সময় কাটিয়েছেন এবং নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছেন। ক্রিকেটের বাইশ গজে এখন ম্যাডিনসন কেবল একজন খেলোয়াড় নন, বরং তিনি অগণিত মানুষের কাছে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা, যিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে ফিরে এসেছেন জীবনের উৎসবে।
