পটুয়াখালী সদর উপজেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামে এখন সবুজের মাঝে লাল আর হলুদের সমারোহ। সারিবদ্ধ মাঝারি আকৃতির গাছগুলো ফলে ভারে নুয়ে পড়ছে। থোকায় থোকায় ঝুলছে থাই আপেল কুল, কাশ্মিরি ও বলসুন্দরী জাতের সুস্বাদু বরই। এই দৃশ্য শুধু একটি বাগানের নয়, বরং একজন অদম্য সাহসী নারী উদ্যোক্তার স্বপ্ন পূরণের গল্প। পটুয়াখালীতে বরই চাষ করে সফলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গৃহবধূ তাসলিমা বেগম। তার এই উদ্যোগ জেলার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার মরিচবুনিয়া ইউনিয়নের গুয়াবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা তাসলিমা বেগম আজ এলাকার নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার নাম। তিন বছর আগে প্রতিবেশী একটি গ্রামের বরই বাগান দেখে তার মনে কৃষিতে নতুন কিছু করার ইচ্ছা জাগে। সেই আগ্রহ থেকেই স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে বাড়ির সামনের নদীর তীরবর্তী পড়ে থাকা পতিত জমিতে বরই চাষের পরিকল্পনা করেন তিনি। যে জমিতে আগে আগাছা ছাড়া কিছুই হতো না, আজ সেখানে বছরে লক্ষাধিক টাকার ফলন হচ্ছে।
তাসলিমা বেগম যশোর থেকে উন্নত জাতের ১০০টি কলম চারা সংগ্রহ করে তার স্বপ্নযাত্রা শুরু করেন। সঠিক পরিচর্যা, জৈব সারের ব্যবহার এবং নিয়মিত যত্নের ফলে মাত্র এক বছরের মাথায় গাছগুলোতে ফল আসতে শুরু করে। বর্তমানে তার বাগানে থাই আপেল কুল, কাশ্মিরি আপেল কুল ও বলসুন্দরীসহ বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাতের বরই রয়েছে। প্রথম বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক চাষে লাভ কিছুটা কম হলেও দ্বিতীয় বছর থেকে তিনি বড় অঙ্কের লাভের মুখ দেখতে শুরু করেন।
নিজের এই অর্জনের বিষয়ে তাসলিমা বেগম বলেন, “প্রথম দিকে এক বিঘা জমিতে চাষ শুরু করেছিলাম। সার ও ওষুধের খরচ প্রথম বছর একটু বেশি হলেও পরবর্তী বছরগুলোতে খরচ অনেক কমে যায়। গত বছর আমি প্রায় এক লাখ টাকার বরই বিক্রি করেছি। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত মাত্র ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, কিন্তু আশা করছি সব মিলিয়ে দেড় লাখ টাকার উপরে বরই বিক্রি করতে পারব। একবার চারা রোপণ করলে বছরের পর বছর ফল পাওয়া যায়, এটাই এই চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা।”
বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি বরই প্রায় ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তাসলিমা আশা করছেন, প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে ২০ থেকে ২৫ কেজি ফল পাওয়া যাবে। তার বাগানের বরইগুলো আকারে বড় এবং অত্যন্ত মিষ্টি হওয়ায় প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সরাসরি বাগান থেকে ফল কিনতে আসছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মাকসুদা বেগম জানান, তাসলিমার সাফল্য দেখে গ্রামের অন্য নারীরাও এখন বাড়ির আঙিনায় বা পতিত জমিতে বরই চাষের কথা ভাবছেন।
তাসলিমা বেগমের ব্যক্তিগত জীবনও বেশ বৈচিত্র্যময়। এক সময় তিনি ঢাকায় কর্মসূত্রে অবস্থান করলেও এখন নিজ গ্রামে থেকে কৃষিকাজে যুক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তার স্বামী ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং একমাত্র সন্তান সৌদি আরব প্রবাসী। পরিবারের সচ্ছলতা থাকা সত্ত্বেও নিজে কিছু করার তাগিদ থেকেই তিনি এই শ্রমসাধ্য কাজ বেছে নিয়েছেন।
পটুয়াখালী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম মজুমদার এই নারী উদ্যোক্তার সাফল্যকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, পটুয়াখালীর মাটি ও জলবায়ু উন্নত জাতের বরই চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সরকারি তথ্যমতে, গত বছর পটুয়াখালী সদরে ৩৬ হেক্টর জমিতে বরই চাষ হলেও এ বছর তা বেড়ে ৪০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বাউ কুল ও বলসুন্দরীর মতো জাতগুলো এখানে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কৃষি বিভাগ থেকে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
তাসলিমা বেগমের এই উদ্যোগ কেবল তাকেই অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী করেনি, বরং উপকূলীয় অঞ্চলের অবহেলিত ও পতিত জমি কীভাবে সম্পদে পরিণত করা যায়, তার একটি উজ্জ্বল পথ দেখিয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পেলে পটুয়াখালীর অনেক নারীই তাসলিমার মতো সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারবেন।
