ইরানে অর্থনৈতিক সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া নজিরবিহীন বিক্ষোভ এখন রক্তক্ষয়ী রূপ নিয়েছে। গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই গণআন্দোলন ১৬তম দিনে গড়িয়েছে, আর এই সময়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪৫ জনে। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি’র (এইচআরএএনএ) বরাত দিয়ে এই পরিসংখ্যান জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতের সংখ্যার পাশাপাশি ধরপাকড়ের মাত্রাও বহুগুণ বেড়েছে। বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার ৭২১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান সরকার দেশজুড়ে ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে, যার ফলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে দেশটির যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় এবং ইরানি রিয়ালের রেকর্ড দরপতনের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দ্রুতই পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সহিংসতায় রূপ নেয়। গত সপ্তাহে ইরানের নির্বাসিত সাবেক ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভির আহ্বানে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
বিশেষ করে গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার বিক্ষোভকারীরা রাজপথের দখল নিলে নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি গুলি বর্ষণ শুরু করে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, এই দুই দিনেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, সহিংসতায় নিরাপত্তা বাহিনীর শতাধিক সদস্যও নিহত হয়েছেন। তবে বিক্ষোভকারীদের হতাহতের বিষয়ে তারা এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রদান করেনি।
ইরান সরকার এই পরিস্থিতির জন্য শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে আসছে। তেহরানের দাবি, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে বাইরের দেশগুলো উস্কানি দিয়ে একে ‘সশস্ত্র দাঙ্গায়’ পরিণত করেছে। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন সরকারি অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইরানের এই দমন-পীড়নের কঠোর সমালোচনা করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে দফায় দফায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। গত রোববার সর্বশেষ এক বার্তায় তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। যদিও এই হস্তক্ষেপের ধরন বা সময়সীমা সম্পর্কে তিনি সুনির্দিষ্ট কিছু জানাননি।
ইরানের এই বিক্ষোভের মূলে রয়েছে দেশটির চরম অর্থনৈতিক ধস। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানি রিয়ালের মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে এবং মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। বাজার করতে গিয়ে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ায় এই ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। কিন্তু সরকার আলোচনার পরিবর্তে কঠোর হাতে আন্দোলন দমনের পথ বেছে নেওয়ায় বিক্ষোভকারীরা এখন সরাসরি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি তুলছেন।
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা তথ্য বিভ্রাটের কারণে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইরানি কর্তৃপক্ষের প্রতি সংযম প্রদর্শনের এবং সাধারণ মানুষের বাক-স্বাধীনতা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
