আসন্ন ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করা নতুন রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে মাত্র একটিতে প্রার্থী দিয়েছে। দলটির এই রহস্যজনক নীরবতা বা কৌশলগত অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে—তবে কি দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামকে নিজেদের নির্বাচনী হিসাবের বাইরে রাখছে এনসিপি?
চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ১৬টি আসনের মধ্যে একমাত্র চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) আসনে এনসিপির পক্ষ থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতা জোবাইরুল হাসান আরিফ। বাকি ১৫টি আসনে দলটির কোনো প্রার্থী না থাকায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
যে একটি মাত্র আসনে এনসিপি প্রার্থী দিয়েছে, সেখানেও তাদের পথ মসৃণ নয়। ওই একই আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে মো. আবু নাছের নামে এক প্রভাবশালী নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে পুরোদমে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা চট্টগ্রাম নগরীর ৪টি আসনে তাদের প্রার্থীদের সক্রিয় রেখেছে।
এমতাবস্থায়, শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম-৮ আসনে ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে এনসিপির প্রার্থী মাঠে থাকতে পারবেন কি না, তা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছে। এনসিপি প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফ দাবি করছেন যে জোট থেকে তাকেই চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থী আবু নাছের জানিয়েছেন, জোটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, তিনি বর্তমানে দলীয় নির্দেশেই কাজ করছেন।
জুলাই অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামের ছাত্র-জনতার ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। সেই আন্দোলনের ফসল হিসেবে গঠিত এনসিপি থেকে চট্টগ্রামের মানুষ ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ছিল গগনচুম্বী। নির্বাচনী কার্যক্রমের শুরুতে চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে সাগুফতা বুশরা মিশমা ও চট্টগ্রাম-১৩ আসন থেকে জোবাইরুল আলম মানিকসহ বেশ কয়েকজন নেতা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোটে অংশগ্রহণের পর কেন্দ্র থেকে শুধুমাত্র একজনকে মনোনয়ন জমা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ও চট্টগ্রামের বাসিন্দা জোবাইরুল আলম মানিক সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জুলাই আন্দোলনে চট্টগ্রামের রাজপথ রক্তাক্ত হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। এখানে অনেক যোগ্য প্রার্থী ছিলেন যারা ৫ আগস্টের পর থেকে মানুষের পাশে আছেন। কিন্তু কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা নিয়ে আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ করা হয়নি।”
এনসিপির যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবশক্তি’র কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকরা অতিরিক্ত ঢাকা কেন্দ্রিক হয়ে পড়ছেন। জাতীয় যুবশক্তি চট্টগ্রাম মহানগরের সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব হুজ্জাতুল ইসলাম সাঈদ বলেন, এনসিপি নেত্রী সামান্তা শারমিন ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তারা সারা দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার রাজনীতি করবেন। কিন্তু চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে মাত্র একটিতে প্রার্থী রাখা সেই ঘোষণার পরিপন্থী। তাদের মতে, চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে এনসিপি যদি তার সাংগঠনিক বিস্তার ঘটাতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে দলটি অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী ক্যাডারভিত্তিক দলের সাথে নির্বাচনী জোট করতে গিয়ে এনসিপিকে অনেক ক্ষেত্রেই ছাড় দিতে হচ্ছে। চট্টগ্রামের আসনগুলোতে জামায়াতের শক্তিশালী অবস্থান থাকায় সেখানে নতুন দল হিসেবে এনসিপি কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগর শাখার ভারপ্রাপ্ত আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম স্পষ্ট করেছেন যে, তারা এখনো কেন্দ্রের নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন এবং যেখানে যার গ্রহণযোগ্যতা বেশি, তাকেই জোটের প্রার্থী করা হবে।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে এনসিপি এখন একটি বড় পরীক্ষার মুখে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দাবি মেনে জোবাইরুল হাসান আরিফকে জোটের একক প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং ভবিষ্যতে সারা দেশে দলটির গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা এখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের বাকিগুলোতে প্রার্থী না থাকা কি কৌশলগত পিছুটান, নাকি সাংগঠনিক দুর্বলতা—তা নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে।
