আসন্ন ২০২৬ সালের বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে এক নজিরবিহীন ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক লড়াইয়ের পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক এক প্রাক-নির্বাচনী জনমত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, জনসমর্থনের বিচারে দল দুটির মধ্যে ব্যবধান মাত্র ১.১ শতাংশ। সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি (আইআইএলডি), প্রজেকশন বিডি, জাগরণ ফাউন্ডেশন এবং ন্যারাটিভের যৌথ উদ্যোগে এই জরিপটি পরিচালিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে জরিপের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন আইআইএলডির উর্ধ্বতন কর্মকর্তা শফিউল আলম শাহীন। দেশের ৬৪টি জেলার ২৯৫টি সংসদীয় আসনে পরিচালিত এই জরিপে ২২ হাজার ১৭৪ জন নিবন্ধিত ভোটার সরাসরি অংশ নেন। ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাসব্যাপী এই জনমত সংগ্রহের কাজ চলে।
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, বর্তমানে বিএনপি ৩৪.৭ শতাংশ ভোটারের সমর্থন নিয়ে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। তবে এর ঠিক পেছনেই ৩৩.৬ শতাংশ জনসমর্থন নিয়ে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। পরিসংখ্যানগতভাবে এই সামান্য ব্যবধান আগামী নির্বাচনে দল দুটির মধ্যে এক তীব্র লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এছাড়া নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৭.১ শতাংশ জনসমর্থন পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৩.১ শতাংশ এবং অন্যান্য ছোট রাজনৈতিক দলগুলো সম্মিলিতভাবে ৪.৫ শতাংশ সমর্থন লাভ করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যে গুণগত পরিবর্তন এসেছে, এই জরিপের ফলে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাওয়া দলগুলো এখন ভোটারদের প্রধান পছন্দে পরিণত হয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের পছন্দের পেছনে ভিন্ন ভিন্ন কারণ উঠে এসেছে। বিএনপির সমর্থকদের একটি বড় অংশ, যা প্রায় ৭২.১ শতাংশ, দলটির পূর্ববর্তী শাসনের অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতাকে সমর্থনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ভোটারদের মতে, দেশের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভিজ্ঞ নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের বড় একটি অংশ দলটিকে সমর্থনের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তাদের ‘পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি’। সমর্থকদের দৃষ্টিতে দলটি তুলনামূলকভাবে কম দুর্নীতিগ্রস্ত এবং তাদের নেতা-কর্মীদের সততার বিষয়টি ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। মূলত নৈতিকতা ও স্বচ্ছ রাজনীতির প্রত্যাশা থেকেই ভোটাররা এই দলটির প্রতি ঝুঁকেছেন।
পাশাপাশি, জুলাই বিপ্লবের চেতনা থেকে উদ্ভূত জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) সমর্থনের পেছনে ৩৬.৭ শতাংশ ভোটার ওই ঐতিহাসিক আন্দোলনে দলটির অগ্রণী ভূমিকাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তরুণ প্রজন্মের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই নতুন রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘সিদ্ধান্তহীন ভোটার’। জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভোটার এখনও স্থির করতে পারেননি তারা কাকে ভোট দেবেন। এই ভোটারদের মনোভাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ৩০.১ শতাংশ ভোটার কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছেন না। এছাড়া ৩৮.৬ শতাংশ ভোটার কৌশলগত কারণে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করেননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ১৭ শতাংশ নিরপেক্ষ বা সিদ্ধান্তহীন ভোটারই আগামী নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে ‘গেম চেঞ্জার’ বা ভাগ্যবিধাতা হিসেবে কাজ করবেন। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে এই বিশাল অংশকে নিজেদের পক্ষে টানতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে ক্ষমতার চাবিকাঠি।
সংবাদ সম্মেলনে শফিউল আলম শাহীন উল্লেখ করেন যে, সাধারণ ভোটাররা শুধুমাত্র ক্ষমতার পরিবর্তন চান না, বরং তারা কাঠামোগত সংস্কারের প্রতি অধিক আগ্রহী। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের একটি বিশাল অংশ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, দুর্নীতি নির্মূল এবং জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। ভোটারদের এই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারাটাই হবে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সংবাদ সম্মেলনে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক মুশতাক খান, নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেসের ডিন ড. এ.কে.এম ওয়ারেসুল করিম এবং বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুরসহ দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও শিক্ষাবিদরা উপস্থিত ছিলেন। তারা মনে করেন, এই জরিপের ফলাফল নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সাধারণ মানুষের মনের ভাষা বুঝতে সাহায্য করবে। একটি অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনমতের এই প্রতিফলন ঘটলে তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভিতকে আরও শক্তিশালী করবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
