দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ২৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও প্রাণনাশের হুমকির মামলা থেকে চূড়ান্তভাবে অব্যাহতি পেয়েছেন দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী এবং তার ভাই আলিসান চৌধুরী। মামলার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা না পাওয়ায় এবং বাদীপক্ষের তথ্যপ্রমাণে অসংগতি থাকায় আজ সোমবার (১২ জানুয়ারি) ঢাকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ এর বিচারক মো. আদনান জুলফিকার শুনানি শেষে তাদের এই মামলা থেকে মুক্তির আদেশ দেন। একইসঙ্গে আদালতের নির্দেশে মামলাটি নথিভুক্ত বা নথিজাত করে আইনি কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
সোমবার সকালে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন মেহজাবীন চৌধুরী ও তার ভাই আলিসান চৌধুরী। এ সময় অভিনেত্রীর মুখে কালো মাস্ক থাকলেও তাকে বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছিল। শুনানির শুরুতেই আসামিপক্ষের আইনজীবী মেহজাবীন ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি অভিযোগকে ‘কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শেষে ম্যাজিস্ট্রেট তাদের এই মামলা থেকে পূর্ণ নিষ্কৃতি প্রদান করেন। আদালতের এই আদেশের মাধ্যমে মেহজাবীন চৌধুরীর দীর্ঘদিনের মানসিক ও আইনি উদ্বেগের অবসান ঘটল।
আদালতের কার্যক্রম শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবী তুহিন হাওলাদার গণমাধ্যমকে জানান, “আমরা আদালতের কাছে মেহজাবীন চৌধুরী ও তার ভাইয়ের নির্দোষ হওয়ার পক্ষে জোরালো তথ্য ও প্রমাণ দাখিল করেছি। মামলার এজহারে বর্ণিত ৭৯ লাইনের যে অভিযোগ করা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সাজানো।
বিশেষ করে বাদী দাবি করেছিলেন যে মেহজাবীন তাকে হুমকি দিয়েছেন, অথচ বাদীর সঙ্গে মেহজাবীন বা তার ভাইয়ের কখনোই সরাসরি কোনো সাক্ষাৎই হয়নি। কোনো প্রমাণ ছাড়াই কেবল হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এই মামলাটি করা হয়েছিল। আদালত আমাদের দালিলিক প্রমাণ ও যুক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন।”
মামলার প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, আমিরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি মেহজাবীন ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ এনে মামলাটি দায়ের করেছিলেন। বাদীর দাবি ছিল, একটি পারিবারিক ব্যবসায় অংশীদার করার প্রলোভন দেখিয়ে মেহজাবীন ও আলিসান চৌধুরী বিভিন্ন সময়ে নগদ ও বিকাশ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তার কাছ থেকে সর্বমোট ২৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
ব্যবসায়ী কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে তারা কালক্ষেপণ করতে থাকেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছিল, গত বছরের ১৬ মার্চ রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় টাকা ফেরত চাইলে মেহজাবীন ও তার ভাই তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং জীবননাশের হুমকি দেন।
এই মামলার প্রেক্ষিতে গত বছরের ২৪ মার্চ আইনি লড়াই শুরু হয়। একপর্যায়ে গত ১০ নভেম্বর মেহজাবীন ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন আদালত। পরবর্তীতে ১৬ নভেম্বর তারা আদালতে আত্মসমর্পণ করে স্থায়ী জামিন লাভ করেন।
পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন এবং আদালতের নিবিড় পর্যবেক্ষণে বাদীর অভিযোগের সপক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে আর্থিক লেনদেনের কোনো স্বচ্ছ নথিপত্র বা ঘটনার দিনের সিসিটিভি ফুটেজ বা সাক্ষী না থাকায় মামলাটি আইনি ভিত্তি হারায়।
বিনোদন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন জনপ্রিয় তারকার বিরুদ্ধে এমন অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ কেবল তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য করা হয়েছিল। মামলা থেকে অব্যাহতির মাধ্যমে মেহজাবীনের স্বচ্ছতা পুনরায় প্রমাণিত হলো। আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করার সময় মেহজাবীন চৌধুরী কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও তার আইনজীবীর মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
বর্তমানে তিনি পুনরায় তার নিয়মিত শুটিং শিডিউলে ব্যস্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আদলে বলা যায়, তারকাদের বিরুদ্ধে এমন হয়রানিমূলক মামলা কেবল বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়েই একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সুশৃঙ্খল আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মোকাবিলা সম্ভব।
