শীতকালীন রসনার তৃপ্তিতে মটরশুঁটির কদর চিরকালই প্রথম সারিতে। তবে খাবারের স্বাদ বৃদ্ধির বাইরেও এই ক্ষুদ্র দানাগুলোর পুষ্টিগুণ অত্যন্ত সমৃদ্ধ যা আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে বিশেষভাবে স্বীকৃত। যদিও সাধারণ মানুষের কাছে এটি একটি অতি পরিচিত সবজি হিসেবে পরিগণিত, তবে উদ্ভিদবিজ্ঞানের পরিভাষায় মটরশুঁটি আসলে কোনো সাধারণ সবজি নয়; বরং এটি শিম বা লিগিউম জাতীয় উদ্ভিদ। ছোলা, মসুর ডাল কিংবা চিনাবাদামের মতো এটিও একই গোত্রভুক্ত। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য মানদণ্ড অনুযায়ী, মটরশুঁটি প্রোটিন, ফাইবার এবং নানাবিধ মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্টের এক চমৎকার উৎস, যা দীর্ঘমেয়াদী রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মটরশুঁটির সর্বোচ্চ পুষ্টিগুণ বজায় রাখা অনেকটাই নির্ভর করে এর প্রস্তুতি প্রণালীর ওপর। পুষ্টিবিদদের মতে, অতিরিক্ত তেল বা মাখন ব্যবহার করে মটরশুঁটি রান্না করলে তাতে চর্বির পরিমাণ বেড়ে যায়, যা এর প্রাকৃতিক গুণাগুণকে কিছুটা ক্ষুণ্ণ করতে পারে। সেদ্ধ করার তুলনায় ভাপিয়ে বা স্টিম করে রান্না করা হলে এর মধ্যে থাকা ভিটামিন ও খনিজ উপাদানগুলো অধিক মাত্রায় সংরক্ষিত থাকে। এমনকি কাঁচা মটরশুঁটিও স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তথ্য বলছে, এক কাপ পরিমাণ লবণমুক্ত সেদ্ধ মটরশুঁটি থেকে প্রায় ১৩৪ ক্যালোরি শক্তি পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পুষ্টি উপাদানের মধ্যে রয়েছে ৪১ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন ‘কে’, ১০১ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট, ২৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’, ২ মিলিগ্রাম জিঙ্ক, ৬২ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম এবং ২.৫ মিলিগ্রাম আয়রন। এই প্রতিটি উপাদানই শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকলাপ সচল রাখতে অপরিহার্য।
বিশেষ করে যারা উদ্ভিজ্জ খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল বা নিরামিষভোজী, তাদের জন্য মটরশুঁটি প্রোটিনের এক আদর্শ বিকল্প। প্রতি কাপ মটরশুঁটিতে প্রায় ৮ গ্রাম প্রোটিন থাকে। প্রাণিজ প্রোটিনের তুলনায় মটরশুঁটির প্রোটিন হজম করা অনেক বেশি সহজসাধ্য। প্রোটিন মূলত একটি অতি প্রয়োজনীয় ম্যাক্রো-নিউট্রিয়েন্ট যা শরীরের পেশি, টিস্যু এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গঠন ও ক্ষয়পূরণে কাজ করে। শরীরের হরমোন ও এনজাইম নিয়ন্ত্রণসহ চুল, ত্বক এবং হাড়ের মজবুত গঠনেও এর বিকল্প নেই। নিয়মিত মটরশুঁটি গ্রহণ করলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পেশির গঠন ত্বরান্বিত হয়।
পাচনতন্ত্র বা অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষায় মটরশুঁটির ফাইবার অত্যন্ত কার্যকরী। এক কাপ রান্না করা মটরশুঁটিতে প্রায় ৯ গ্রাম ফাইবার বা আঁশ থাকে। এই ফাইবারের সিংহভাগই অদ্রবণীয় প্রকৃতির, যা অন্ত্রের গতিশীলতা বৃদ্ধি করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো দীর্ঘস্থায়ী ও যন্ত্রণাদায়ক সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়। অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য রক্ষায় এই উদ্ভিদজাত আঁশগুলো প্রাকৃতিকভাবেই কাজ করে, যা সামগ্রিক বিপাক প্রক্রিয়াকে উন্নত করে।
বর্তমান সময়ে ওজন নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মটরশুঁটি স্বাস্থ্যকর উপায়ে শরীরের ওজন বজায় রাখতে বা ওজন বাড়াতে সহায়তা করে। এর উচ্চ প্রোটিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ উপাদানগুলো ভাঙতে শরীরের তুলনামূলক বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়। ফলে এটি গ্রহণ করার পর দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকার অনুভূতি হয় এবং বারবার অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের প্রবণতা হ্রাস পায়। এতে করে অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণের ঝুঁকি কমে এবং শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয় করতে পারে।
মটরশুঁটির অন্যতম একটি শক্তিশালী দিক হলো এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণাগুণ। এটি ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট এবং পলিফেনল সমৃদ্ধ, যা শরীরের কোষগুলোকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিকেলের হাত থেকে সুরক্ষা দেয়। ফ্রি র্যাডিকেল হলো এমন কিছু উপাদান যা শরীরের সুস্থ কোষ ও টিস্যু ধ্বংস করে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। এই দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ থেকেই মূলত হৃদরোগ, ক্যান্সার এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো জটিল রোগগুলো দানা বাঁধে। মটরশুঁটির নিয়মিত উপস্থিতি শরীরে একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর তৈরি করে যা এই ধরনের প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনে।
দৃষ্টিশক্তি এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বজায় রাখতেও মটরশুঁটি সমানভাবে পারদর্শী। এতে প্রচুর পরিমাণে লুটেইন এবং জিএক্সানথিন নামক ক্যারোটিনয়েড থাকে, যা মটরশুঁটির উজ্জ্বল সবুজ রঙের জন্য দায়ী। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এই উপাদানগুলো চোখকে ক্ষতিকারক নীল আলো থেকে রক্ষা করে, যা আধুনিক যুগের ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট চোখের ক্ষতি প্রতিরোধে সহায়ক। এছাড়া এর ভিটামিন ‘সি’ ত্বকের কোলাজেন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে, যা অকাল বার্ধক্য রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। সামগ্রিকভাবে, মটরশুঁটি কেবল একটি সুস্বাদু খাবার নয়, বরং এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাকৃতিক সুপারফুড যা সুস্থ জীবনযাপনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
