লেখক, স্থপতি ও চলচ্চিত্রনির্মাতা শাকুর মজিদ পৃথিবীর নানা শহরে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেছেন: ‘ঢাকা কি বসবাসের যোগ্য?’ তার মতে, এই শহরের কার্যকারিতা এবং বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী বসবাসের অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও এক অদ্ভুত প্রাণশক্তি ও মানবীয় আকর্ষণ তাকে বারবার ফিরিয়ে আনে। তার এই বিশ্লেষণটি সম্প্রতি প্রকাশিত ‘দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (EIU)’-এর গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স ২০২৫-এর ফলাফলের সঙ্গে ঢাকার বাস্তবতাকে মিলিয়ে দেখেছে।
EIU প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় ১৭৩টি শহরের বাসযোগ্যতা বিশ্লেষণ করে সূচক প্রকাশ করে। ২০২৫ সালের এই সূচকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। কষ্টের খবর হলো, মাত্র দুটি শহর ঢাকার চেয়ে খারাপ অবস্থানে আছে—যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ার ত্রিপোলি এবং সিরিয়ার দামেস্ক। অর্থাৎ, বাসযোগ্যতার নিরিখে ঢাকা পৃথিবীর নিকৃষ্ট শহরগুলোর দৌড়ে তৃতীয়।
এই উদ্বেগজনক অবস্থানকে আরও ভালোভাবে বুঝতে লেখক পাপুয়া নিউ গিনির রাজধানী পোর্ট মোরসবির সঙ্গে তুলনা করেন, যা বাসযোগ্যতার মাপকাঠিতে একসময় সর্বনিম্ন স্থানে ছিল। লেখকের মতে, নিকৃষ্টের সঙ্গে নিকৃষ্টের এই প্রতিযোগিতা দেশের জন্য কোনো শান্তির বার্তা নয়। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন (দ্বিতীয়) বা ডেনমার্কের কোপেনহেগেনের (প্রথম) মতো নিরাপদ ও বাসযোগ্য শহরের বিপরীতে ঢাকার এই অবস্থান গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়কে নির্দেশ করে।
EIU যে পাঁচটি মূল মানদণ্ডে শহরের বাসযোগ্যতা যাচাই করে, ঢাকা তার মধ্যে তিনটি ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন স্কোর পেয়েছে।
EIU-এর প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো স্থিতিশীলতা—অর্থাৎ অপরাধ, সন্ত্রাস, যুদ্ধ বা সিভিল বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি। এই বিভাগেই ঢাকার স্কোর সর্বনিম্ন। লেখক তুলে ধরেছেন, ঢাকা শহরে ছিনতাই, পকেটমারা এবং রাস্তার অপরাধগুলো সাধারণ ঘটনা। রাজনৈতিক সহিংসতা, আন্দোলন, অবরোধ—এগুলো নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে এক স্থায়ী আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ঘড়ি-গয়না না পরে বেরোনোর পরামর্শ, বা অতিরিক্ত টাকা না রাখার সতর্কতা—এই চিত্রগুলোই দেখায়, কেন ঢাকার ‘মানসিক নিরাপত্তা’ সর্বনিম্ন এবং কেন বাসযোগ্যতা এত প্রশ্নবিদ্ধ।
EIU সূচকে ঢাকার সবচেয়ে নিম্ন স্কোর এসেছে অবকাঠামো খাতে।
যানজট ও ধীরগতি: ঢাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহর হিসেবে ধরা হয়, যেখানে গাড়ির গড় গতি মাত্র ৫-৭ কিমি/ঘণ্টা। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, সড়কের সংকীর্ণতা এবং সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থার অভাবে কোটি মানুষের উৎপাদনশীল সময় প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে।
বুনিয়াদী পরিষেবার ব্যর্থতা: সামান্য বৃষ্টিতে রাস্তায় হাঁটুপানি জমে যাওয়া প্রমাণ করে সমন্বিত স্যুয়ারেজ-ড্রেনেজ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দুর্বল; অনেক এলাকায় নিয়মিতভাবে আবর্জনা পরিষ্কার হয় না।
অন্যান্য সংকট: লোডশেডিং, গ্যাস সংকট এবং ‘স্মার্ট সিটি’ সিস্টেমের অভাব ঢাকার অবকাঠামো স্কোরকে ক্রমাগত নিচে নামাচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা এবং সংস্কৃতি ও পরিবেশ—এই দুটি মানদণ্ডেও ঢাকার পরিস্থিতি ভয়াবহ।
স্বাস্থ্যসেবা: শহরের জনসংখ্যার তুলনায় স্বাস্থ্যসেবার মান বহু নিচে। সচ্ছল শ্রেণি চিকিৎসার জন্য ব্যাংকক বা সিঙ্গাপুর ছোটেন, কারণ তারা ঢাকার চিকিৎসায় আস্থা রাখেন না। সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংকট, ভিড় এবং চিকিৎসকের অভাব মধ্যবিত্তদের সংকটে ফেলে।
পরিবেশ দূষণ: বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকা প্রায়ই ১ নম্বরে থাকে। শীতকালে বায়ুদূষণের মাত্রা (PM2.5) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের চেয়ে ৮-১২ গুণ বেশি থাকে। শব্দদূষণ, উন্মুক্ত স্থানের অভাব, এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ (যা অগ্নিকাণ্ড ঝুঁকি বাড়ায়) নাগরিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এমনকি ওয়াসার পানিও বিশুদ্ধ নয় জেনে বোতলের পানি কিনতে বাধ্য হওয়া, স্বাস্থ্যসূচককে নিম্নগামী করছে।
১৮ নভেম্বর ২০২৫ প্রকাশিত জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রস্পেক্টস’ প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল নগরী হলো ঢাকা (জাকার্তার পরই)। এই জনমিতি আরও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। প্রতিবেদন বলছে, আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকা জাকার্তাকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নগরীতে পরিণত হবে, যার জনসংখ্যা হবে প্রায় ৫ কোটি ২১ লাখ। এই বিপুল জনসংখ্যা বৃদ্ধি ভাঙা অবকাঠামো এবং দুর্বল প্রশাসনকে আরও দ্রুত অকার্যকর করে তুলবে।
শাকুর মজিদ উপসংহারে এসে এই ভয়াবহ চিত্রের বিপরীতে ঢাকার এক অনন্য চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি স্বীকার করেন, ঢাকার সমস্যা অগণিত এবং এর বিশৃঙ্খলা প্রাত্যহিক জীবনের অংশ। তবুও, লেখক মনে করেন, এই শহরের আসল শক্তি হলো এর ৯৫ শতাংশ সাধারণ মানুষ—যারা অবিশ্বাস্য রকমের সরল, ভদ্র ও মানবিক। যারা কঠোর পরিশ্রম করে, সততা ধরে রাখে এবং দৈনন্দিন বিশৃঙ্খলার সঙ্গে সংগ্রাম করে জীবনকে উদযাপন করে। তিনি মনে করেন, দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক পচনের শিকার শ্রেণিটি সংখ্যায় খুবই কম। এই শহর বেঁচে আছে মূলত মানুষের পরিশ্রম, সংস্কৃতি ও সংগ্রামের শক্তিতে।
তবে বিশ্বমানের একটি বাসযোগ্য শহর হতে হলে লেখকের মতে, প্রয়োজন—দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, পরিবেশের উন্নয়ন, দুর্নীতির অবসান, জনপরিবহন বিপ্লব, এবং নদী ও খালের পুনরুদ্ধার। ঢাকা একদিন অবশ্যই বদলাবে—এই আশাবাদ রেখেই লেখক তার বিশ্লেষণ শেষ করেছেন।
