যে মাটির নিচ থেকে উত্তোলিত গ্যাসে সচল থাকে দেশের জাতীয় গ্রিড এবং কলকারখানা, সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরেই এখন জ্বলছে না রান্নার চুলা। দেশের বৃহত্তম তিতাস গ্যাসফিল্ডের অবস্থান এই জেলায় হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিনের তীব্র গ্যাস সংকটে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের দাবিতে রোববার সকালে শহরের কাউতলি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে এক বিশাল অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়েছে। নিজ জেলার সম্পদ থাকা সত্ত্বেও প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার এই ক্ষোভ এখন গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
রোববার সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে অংশ নেন বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সাধারণ গৃহিণী, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা। ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে তারা বর্তমান সরবরাহ ব্যবস্থার চরম অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। অংশগ্রহণকারীদের স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে কাউতলি মোড়, যার ফলে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল ব্যাহত হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি একটাই— তিতাসের শহরকে আগে পর্যাপ্ত গ্যাস দিতে হবে, তারপর অন্য জেলায় সরবরাহ।
বক্তব্যের শুরুতে স্থানীয় নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসফিল্ড দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ পূরণ করছে। অথচ এখানকার মানুষ নিয়মিত মাসিক বিল পরিশোধ করেও রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না। বিশেষ করে বর্তমান শীত মৌসুমে সংকটের মাত্রা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বক্তারা অভিযোগ করেন, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ স্থানীয় গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিবর্তে বিমাতাসুলভ আচরণ করছে।
অবস্থান কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নাছির আহমেদ, জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক এ বি এম মুছা এবং জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক শেখ হাফিজ উল্লাহ। এছাড়াও ঐক্যবদ্ধ সদর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুখপাত্র আরিফ বিল্লাহ এবং তরী বাংলাদেশের সদস্য সোহেল রানা ভূঁইয়াসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী সাত দিনের মধ্যে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তিতাস গ্যাস আঞ্চলিক কার্যালয় ঘেরাওসহ আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
আন্দোলন চলাকালে জনদুর্ভোগের খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রঞ্জন দে এবং সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিফাত মো. ইশতিয়াক ভূঁইয়া। তারা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং এই সমস্যার সমাধানে উচ্চপর্যায়ে কথা বলার আশ্বাস দেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পর আন্দোলনকারীরা সাময়িকভাবে কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন।
ভুক্তভোগী গৃহিণীরা জানান, প্রতিদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাসের চাপ একদম থাকে না। কাউতলি এলাকার বাসিন্দা সুলতানা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, “সকালে চুলা জ্বলে না, দুপুরে আধা ঘণ্টা আর রাতে হয়তো এক ঘণ্টা টিমটিমে গ্যাস পাওয়া যায়। আমাদের সন্তানদের না খেয়ে স্কুলে পাঠাতে হয়।” অন্যদিকে, বাণিজ্যিক গ্রাহক ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন যে, গ্যাস না থাকায় তারা ব্যয়বহুল এলপি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
উল্লেখ্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থিত তিতাস গ্যাস ফিল্ডের ২৭টি সক্রিয় কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম এই প্রাণকেন্দ্রে স্থানীয় সরবরাহ লাইনের জরাজীর্ণ অবস্থা এবং অবৈধ সংযোগের কারণে চাপ কমে যাচ্ছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর দাবি, তাদের এই মৌলিক অধিকার রক্ষায় অবিলম্বে কারিগরি সংস্কার ও সরবরাহের বৈষম্য দূর করতে হবে।

