বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শরীয়তপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাতে ভেদরগঞ্জ উপজেলার মহিষার ইউনিয়নে বিএনপি আয়োজিত একটি মতবিনিময় সভায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অংশগ্রহণ এবং সেখানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান প্রদানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়েছে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই রাজনৈতিক শিবিরের এমন নজিরবিহীন ‘সহাবস্থান’ এখন জেলার সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রধান আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওই রাতে শরীয়তপুর-৩ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুর সমর্থনে মহিষার ইউনিয়নে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে আকস্মিকভাবে মহিষার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম চৌকিদার তার নেতাকর্মীসহ উপস্থিত হয়ে ধানের শীষের প্রার্থীর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন ব্যক্ত করেন। তার সঙ্গে ভেদরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হোসেন মোড়ল এবং মহিষার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অরুণ হাওলাদারসহ প্রায় দুই শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে রফিকুল ইসলাম চৌকিদার বলেন, “এলাকার প্রকৃত উন্নয়নের স্বার্থে আগামী নির্বাচনে মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপু ভাইকে ধানের শীষে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করা প্রয়োজন। তিনি দেশনায়ক তারেক রহমান তথা জিয়া পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন ব্যক্তি। তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে ভেদরগঞ্জ উপজেলার সার্বিক উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটবে।” বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে অভ্যাসবশত তিনি ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিলে সভায় উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এই মুহূর্তটির ভিডিও চিত্র পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় তোলপাড়।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী বিষয়টিকে ‘সুবিধাবাদী রাজনীতি’ হিসেবে দেখলেও কেউ কেউ একে রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। বিষয়টি নিয়ে জানতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় বিএনপি নেতৃত্ব বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছে।
ভেদরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বিএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত হলো দল-মত নির্বিশেষে দেশের কল্যাণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করা। কে কোন দল করে সেটি বড় কথা নয়, বরং সবাই এ দেশের সম্মানিত ভোটার। আমরা বৈষম্যহীন রাজনীতিতে বিশ্বাসী। আমাদের প্রচারণায় কে স্লোগান দিল বা না দিল, তা আমাদের কাছে মুখ্য বিষয় নয়; আমরা চাই সবার অংশগ্রহণমূলক একটি সুন্দর পরিবেশ।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শরীয়তপুরের এই ঘটনাটি দেশের প্রচলিত মেরুকরণের রাজনীতিতে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। নির্বাচনের আগমুহূর্তে আওয়ামী লীগের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের এই সমর্থন পরিবর্তনের পেছনে স্থানীয় উন্নয়ন ও নেতৃত্বের গুণাবলি কাজ করেছে নাকি অন্য কোনো কৌশল রয়েছে, তা নিয়ে জল্পনা চলছে। তবে এই ভাইরাল ভিডিওটি যে শরীয়তপুর-৩ আসনের নির্বাচনী লড়াইয়ে এক নতুন উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

