দেশের ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনা রোধ এবং বিশেষ করে মোটরসাইকেল আরোহীদের নিরাপত্তা সুসংহত করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এখন থেকে দেশে যেকোনো মোটরসাইকেল বিক্রির সময় ক্রেতাকে বিএসটিআই (BSTI) অনুমোদিত দুটি হেলমেট বিনামূল্যে প্রদান করা বাধ্যতামূলক হচ্ছে।
এই সংক্রান্ত একটি নতুন নীতিমালা বর্তমানে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। শনিবার (১০ জানুয়ারি) দুপুরে নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিআরটিএ-র চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেন।
বিআরটিএ চেয়ারম্যান তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, মোটরসাইকেল বিক্রির ক্ষেত্রে বিক্রেতাদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। এই নীতিমালা কার্যকর হলে, প্রতিটি মোটরসাইকেল বিক্রির সঙ্গে মানসম্মত দুটি হেলমেট ফ্রি দেওয়া বিক্রেতার আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়বে।
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে বয়সের বাধ্যবাধকতা নিয়ে কোনো ধরনের শিথিলতা প্রদর্শন করা হবে না। অপ্রাপ্তবয়স্কদের লাইসেন্স না দেওয়ার বিষয়ে অনড় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়ে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান।
সড়ক দুর্ঘটনার উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরে আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমানে দেশে সংঘটিত মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৭৩ শতাংশই মোটরসাইকেল কেন্দ্রিক। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের একটি বিশাল অংশ ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ। দেশের ভবিষ্যৎ এই যুবসমাজের অকাল মৃত্যু রোধ করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি গুরুত্বারোপ করেন যে, অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে উৎপাদনশীল এই জনশক্তির অকাল মৃত্যু যেকোনো মূল্যে কমাতে হবে। এজন্য কেবল আইন প্রয়োগ নয়, বরং সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা একান্ত প্রয়োজন।
বিআরটিএ-র সেবার মানোন্নয়ন প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান জানান, সংস্থাটি এখন আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দাপ্তরিক সব কার্যক্রমকে অটোমেশনের আওতায় আনা হচ্ছে এবং চলতি মাসের শেষ নাগাদ অধিকাংশ সেবা অনলাইনে চালু হবে। এর ফলে সাধারণ মানুষকে আর সশরীরে বিআরটিএ কার্যালয়ে এসে হয়রানির শিকার হতে হবে না। তবে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত সহযোগিতার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।
আলোচনা সভা শেষে এক আবেগঘন পরিবেশে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ৪১টি পরিবারের মাঝে মোট এক কোটি ৬৫ লাখ টাকার আর্থিক অনুদান বিতরণ করা হয়। বিআরটিএ নোয়াখালী সার্কেলের উদ্যোগে এই সহায়তার আওতায় নোয়াখালী জেলার নিহত ২০ জন ও আহত একজনের পরিবারকে ১ কোটি ১ লাখ টাকা এবং লক্ষ্মীপুর জেলার ১১ জন নিহতের পরিবার ও ৯ জন আহতসহ ২০টি পরিবারকে ৬৪ লাখ টাকা প্রদান করা হয়।
নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিআরটিএ পরিচালক (যুগ্ম সচিব) রুবাইয়াৎ-ই-আশিক এবং বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. মাসুদ আলম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসলিমুন নেছা। অনুষ্ঠানে সিভিল সার্জন ও পুলিশ সুপারের প্রতিনিধিবর্গসহ পরিবহন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে এই আর্থিক সহায়তাকে সরকারের একটি মানবিক ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

