“পুলিশে কইছে সরকার আনবে, কিন্তু কবে আনবে তা তো মোগো কয় না।”—অশ্রুসিক্ত চোখে এই আকুতি বরগুনার জেলে ইউনুস সর্দারের বৃদ্ধা মা তারাবানুর। দীর্ঘ দুই বছর আগে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া ছেলের ফেরার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছেন তিনি। ঘূর্ণিঝড় মিধিলির তাণ্ডবে হারিয়ে যাওয়া ১৭ জন জেলের সন্ধান মিলেছে সুদূর ভারতের গুজরাটের একটি কারাগারে। এই খবর পাওয়ার পর নিখোঁজ জেলেদের পরিবারগুলোতে যেমন স্বস্তির হাওয়া বইছে, তেমনই তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উৎকণ্ঠা।
ঘটনাটি ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বরের। বরগুনার পাথারঘাটা ও সদর উপজেলার ১৭ জন জেলে ‘এফবি এলাহী ভরসা’ নামের একটি ট্রলার নিয়ে বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকারে যান। কিন্তু সেই রাতেই ঘূর্ণিঝড় মিধিলির কবলে পড়ে ট্রলারটি নিখোঁজ হয়। এরপর দীর্ঘ দুই বছর ধরে তাদের কোনো খোঁজ মেলেনি। স্বজনরা ধরে নিয়েছিলেন হয়তো তারা আর বেঁচে নেই। কিন্তু সম্প্রতি সরকারি বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ঝড়ের কবলে পড়ে দিকভ্রান্ত হয়ে ভারতীয় জলসীমায় প্রবেশ করায় তারা দেশটির কোস্ট গার্ডের হাতে আটক হন এবং বর্তমানে গুজরাটের একটি কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের মরখালী গ্রামেই নিখোঁজ ৫ জেলের বাড়ি। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিখোঁজ আউয়াল বিশ্বাসের স্ত্রী নার্গিস, মাহতাবের স্ত্রী খাদিজা বেগমসহ অন্য স্বজনরা এখন কেবল সরকারের দিকে তাকিয়ে আছেন। খাদিজা বেগম বলেন, “স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর মানুষের বাসায় কাজ করে খেয়ে না খেয়ে সংসার চালিয়েছি। এখন শুনছি তারা বেঁচে আছে। সরকার যদি একটু উদ্যোগ নেয়, তবেই তারা ফিরে আসতে পারবে।”
নিখোঁজ ইউনুস সর্দারের ভাই ইদ্রিস জানান, স্থানীয় থানা পুলিশ তাদের বাড়িতে এসে নিখোঁজদের ছবি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে গেছে। পুলিশ তাদের আশ্বস্ত করেছে যে, সরকারি প্রক্রিয়ায় তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ‘কবে’ তারা ফিরবেন, সেই সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ কেউ বলতে পারছে না।
ঢলুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা মোস্তফা কামাল টিটু জানান, দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগতভাবে তিনি এই জেলেদের সন্ধানে কাজ করেছেন। সম্প্রতি জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি) থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে জেলেদের নাম-ঠিকানা যাচাই করা হয়। তিনি বলেন, “জেলে পরিবারগুলো বর্তমানে অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা বিদেশে বন্দি থাকায় তারা দিশেহারা। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনা হোক।”
বরগুনা জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার ইন্টেলিজেন্স অফিসার (ওয়ান) মো. কামরুজ্জামান সংবাদমাধ্যমকে জানান, মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত তালিকা অনুযায়ী তারা কাজ করছেন। নিখোঁজ ১৭ জনের ছবি ও আনুষঙ্গিক তথ্যাদি ইতিমধ্যে ঢাকার বিশেষ শাখায় (এসবি) পাঠানো হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন জানিয়েছেন, নিখোঁজ জেলেদের বিস্তারিত তথ্য ও তালিকা মৎস্য দপ্তরের মাধ্যমে ইতিমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। বর্তমানে বিষয়টি কূটনৈতিক পর্যায়ে রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেই তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
নিখোঁজ জেলেরা হলেন—আউয়াল বিশ্বাস, মাহাতাব, ইউনুস সর্দার, আল-আমীন, কামাল, ফারুক মিস্ত্রি, খালেক, নানটু মিয়া, গাজী মাহমুদ, সিদ্দিক মৃধা, মনির হোসেন, সহিদুল ইসলাম, খলিল, রব, লিটন, সুবাহান খাঁ, শফিকুল ইসলাম ও কালু মিয়া। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই ১৭ জন জলমজুরি আবারও নিজ ভূখণ্ডে ফিরে আসবেন এবং পরিবারের মুখে হাসি ফুটবে—এমনটাই এখন বরগুনাবাসীর প্রত্যাশা।

