আসন্ন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)-এর চূড়ান্ত নিলাম তালিকা থেকে বেশ কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটারকে ফিক্সিংয়ের সন্দেহে বাদ দেওয়ার ঘটনায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বাদ পড়া ক্রিকেটারদের মধ্যে জাতীয় দলের নিয়মিত খেলোয়াড় এনামুল হক বিজয় এবং মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতও রয়েছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) এই কঠোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে শনিবার সন্ধ্যায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিপিএলের সদস্য সচিব ইফতেখার রহমান মিঠু। তিনি জানিয়েছেন, ক্রিকেটারদের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া এলেও বোর্ডের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কারণে কঠোর থাকবে।
ইফতেখার রহমান মিঠু বিসিবির এই সিদ্ধান্তকে খেলার শুদ্ধতা রক্ষার একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত দোষী প্রমাণিত না হচ্ছে, আমরা কাউকে দোষী বলতে পারি না। কিন্তু যেহেতু তারা ‘লাল তালিকাভুক্ত’ (Red-listed) এবং আমরা দুর্নীতি ও ফিক্সিংয়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে যাচ্ছি, তাই এই লাল তালিকাভুক্ত খেলোয়াড়রা নিলামে অন্তর্ভুক্ত নেই।”
ক্রিকেট মাঠে দুর্নীতি রোধে বিসিবি কেবল খেলোয়াড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং দলের সামগ্রিক পরিবেশকে সুরক্ষার জন্য নতুন নীতি প্রয়োগ করেছে। মিঠু জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ সকল অংশগ্রহণকারী দলকে তাদের পুরো স্কোয়াডের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এই তালিকায় কেবল মূল দলের খেলোয়াড়রাই নয়, বরং দলের সাথে যুক্ত সকল সদস্য—যারা হোটেলে অবস্থান করবেন, যারা ড্রেসিংরুমে উপস্থিত থাকবেন—তাদের নামও অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই তালিকার প্রতিটি ব্যক্তির জন্য বিসিবি’র দুর্নীতি দমন ইউনিট (Anti-Corruption Unit) থেকে ছাড়পত্র বা ক্লিয়ারেন্স আবশ্যক। এই ব্যবস্থাটি টুর্নামেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বোর্ডের ব্যাপকভিত্তিক পরিকল্পনার অংশ।
নিলাম থেকে বাদ পড়ার ঘটনায় এনামুল হক বিজয় এবং মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতসহ অন্যান্য বাদ পড়া ক্রিকেটাররা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে মিঠু গভর্নিং কাউন্সিলের পূর্ণ এখতিয়ারের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “তারা প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এখানে গভর্নিং কাউন্সিল হিসেবে আমাদের সব অধিকার আছে। আমরা কাউকে নির্দিষ্ট করে কিছু বলছি না, নামও প্রকাশ করিনি।”
তিনি খেলোয়াড় নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অন্য নিয়মগুলোর সঙ্গে এই সিদ্ধান্তকে তুলনা করে বলেন, “ধরুন, আমরা যেভাবে একটি নিয়ম করেছি যে কেউ ইনজুরি থাকলে তালিকায় থাকতে পারবে না, তেমনি লাল তালিকাভুক্ত খেলোয়াড়দের আমরা তালিকায় রাখব না। এটা সম্পূর্ণ আমাদের সিদ্ধান্ত এবং আমাদের এখতিয়ার আছে।”
মিঠু আরও যুক্তি দিয়ে বলেন, গভর্নিং কাউন্সিল নিলামে সকল আবেদনকারীকে অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য নয়। তিনি বিদেশি খেলোয়াড়দের নির্বাচনের উদাহরণ টেনে বলেন, “দেখুন, বিদেশিরা ৫০০ জন আবেদন করেছিল, আমরা ২৬০ জন নিয়েছি। একইভাবে আমরা এটা করেছি। ক্রিকেট খেললেই যে তাকে নিলামে নিতে হবে, এমন তো কোথাও লেখা নেই।” এই মন্তব্য বোর্ডের এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতাকে নির্দেশ করে।
যদিও খেলোয়াড়দের নিলাম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তবুও মিঠু জোর দিয়ে বলেন যে, তাদের এখনই দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তিনি বলেন, “আমরা বলছি না তারা দোষী। আমরা সেটা আবার আমাদের দুর্নীতি দমন ইউনিটকে দিয়েছি।” তিনি জানান, এই ইউনিট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি অ্যালেক্স মার্শালের তত্ত্বাবধানে কাজ করছে।
সদস্য সচিব ইফতেখার রহমান মিঠু খেলার নৈতিকতা রক্ষার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “এখন যারা লাল তালিকাভুক্ত বা যাদের নিয়ে সন্দেহ করা হচ্ছে, তাদের ব্যাপারে আমার উপায় কী বলুন? আমি যদি তাদের খেলতে দিই, তাহলে ক্রিকেটের জন্য খারাপ বার্তা যাচ্ছে।” তার মতে, বৃহত্তর স্বার্থে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে এই ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া আবশ্যক। ফিক্সিং সন্দেহযুক্ত খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ করালে বিপিএল-এর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হবে এবং দুর্নীতিবাজদের প্রতি দুর্বলতা প্রকাশ পাবে।
বিসিবি’র এই পদক্ষেপ দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট লিগের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা বিপিএল-কে দুর্নীতিমুক্ত ও বিশ্বমানের টুর্নামেন্টে পরিণত করার জন্য কর্তৃপক্ষের আন্তরিক প্রচেষ্টাকে প্রতিফলিত করে। খেলোয়াড়দের ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে অ্যালেক্স মার্শালের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতি দমন ইউনিটের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ওপর।
