মুম্বাইয়ের রূপালি জগতের আলোকোজ্জ্বল ইতিহাসের পাতায় নিজেকে ‘ড্রিম গার্ল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা অভিনেত্রী হেমা মালিনীর পথচলা ছিল যেমন বর্ণিল, তেমনই কণ্টকাকীর্ণ। বর্তমানে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের একজন কিংবদন্তি হিসেবে স্বীকৃত হলেও, শুরুর দিনগুলোতে তাকে যে কেবল পেশাদার প্রতিযোগিতার মোকাবিলা করতে হয়েছে তা নয়, বরং লড়াই করতে হয়েছে এক অদৃশ্য ও রহস্যময় আতঙ্কের সঙ্গে।
চেন্নাইয়ের সচ্ছল ও ছিমছাম জীবন পেছনে ফেলে স্বপ্নের শহর মুম্বাইয়ে পা রাখা এই অভিনেত্রীর জীবনে এমন কিছু স্মৃতি রয়েছে, যা আজও তাকে শিহরিত করে তোলে। সম্প্রতি তার সেই ভয়ংকর ও চাঞ্চল্যকর অভিজ্ঞতার কথা নতুন করে আলোচনায় এসেছে, যা তিনি তার আত্মজীবনীতে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।
বর্ষীয়ান এই অভিনেত্রী তার জীবনের অজানা অধ্যায়গুলো উন্মোচন করেছেন ‘হেমা মালিনী: বিয়ন্ড দ্য ড্রিম গার্ল’ নামক জীবনকথায়। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, বলিউডের তৎকালীন সুপারস্টার ধর্মেন্দ্রর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগের দিনগুলোতে তিনি মুম্বাইয়ের বান্দ্রা এলাকায় একটি ছোট ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন।
সেই সময় তার ক্যারিয়ার ছিল মধ্যগগনে ওঠার প্রস্তুতি পর্বে, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এমন এক অদ্ভুত ও অব্যাখ্যেয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন যা তার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। সেই ফ্ল্যাটে থাকাকালীন তিনি নিয়মিত এক অতিপ্রাকৃত বা অস্বাভাবিক অনুভূতির শিকার হতেন, যা কেবল তার মানসিক শক্তিকেই নয়, বরং শারীরিকভাবেও তাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।
হেমা মালিনী তার সেই শিহরণ জাগানিয়া অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, বান্দ্রার সেই বাসস্থানে থাকাকালীন প্রায় প্রতি রাতেই তিনি এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতেন। যখন তিনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হতেন, তখনই তার মনে হতো অন্ধকার কক্ষের মাঝে অদৃশ্য কোনো এক সত্তা তার গলা টিপে ধরছে।
দম বন্ধ হয়ে আসার মতো এক অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করতেন তিনি। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা দুঃস্বপ্ন ছিল না, বরং প্রায় নিয়মিত বিরতিতে দীর্ঘ সময় ধরে এই ভীতিকর অভিজ্ঞতা তাকে সইতে হয়েছে। একজন উঠতি তারকার জন্য এমন পরিস্থিতি কেবল ভীতিজনকই নয়, বরং মানসিকভাবে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক ছিল।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সেই সময় হেমা একা থাকতেন না; তার মা জয়া চক্রবর্তী সর্বদা তার ছায়াসঙ্গী হিসেবে থাকতেন। এই আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সাক্ষী ছিলেন তার মা-ও। হেমা জানিয়েছেন, মা একই রুমে তার পাশেই ঘুমাতেন এবং রাতের আঁধারে মেয়ের সেই অসহায় অবস্থা নিজের চোখে দেখতেন।
তিনি লক্ষ্য করতেন যে, গভীর রাতে হঠাৎ করেই হেমা ভয়ে কুঁকড়ে যেতেন এবং প্রচণ্ড কাঁপতে শুরু করতেন। অদৃশ্য কোনো এক অশুভ শক্তির প্রভাবে মেয়ের শ্বাসকষ্ট ও ভীতি দেখে তার মা-ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়তেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তারা দুজনেই সেই ফ্ল্যাটে অবস্থান করা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করতে শুরু করেন।
মায়ানগরীর সেই ছোট ফ্ল্যাটটিতে দিনের পর দিন ঘটে চলা এই রহস্যময় ঘটনাপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত হেমা মালিনীকে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। তিনি অনুভব করেন যে, সৃজনশীল কর্মজীবন বজায় রাখার জন্য এবং মানসিক প্রশান্তির খাতিরে এই আতঙ্ক থেকে মুক্তি পাওয়া একান্ত প্রয়োজন। সেই অশুভ স্মৃতির হাত থেকে বাঁচতে তিনি তড়িঘড়ি করে ফ্ল্যাটটি ছেড়ে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এরপরই শুরু হয় একটি নিরাপদ ও শান্তিময় আশ্রয়ের অনুসন্ধান, যা শেষ পর্যন্ত তাকে জুহুর সমুদ্রমুখী এক মনোরম পরিবেশে নিয়ে আসে।
পরবর্তীতে হেমা মালিনী মুম্বাইয়ের অভিজাত এলাকা জুহুতে একটি বিশাল বাগানঘেরা বাংলো ক্রয় করেন। সমুদ্রের নির্মল হাওয়া আর খোলামেলা পরিবেশে এসে তিনি দীর্ঘদিনের সেই আতঙ্ক থেকে মুক্তি পান। অভিনেতা ধর্মেন্দ্রর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর এই বাংলোটিই হয়ে ওঠে তাদের সংসারের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি এই নিরাপদ ও সুখময় নীড়েই কাটিয়েছেন। আজ ক্যারিয়ারের এই সুউচ্চ শিখরে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকালে সেই বান্দ্রার ছোট ফ্ল্যাটের অন্ধকার দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও তিনি শিউরে ওঠেন। তার এই অভিজ্ঞতা কেবল একটি ব্যক্তিগত গল্প নয়, বরং মায়ানগরীর পর্দার পেছনের এমন এক সংগ্রামের কথা যা সচরাচর সাধারণ মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে থেকে যায়।
