জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক এবং কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় কারা আসীন হবে এবং কে সরকার গঠন করবে, তা নির্ধারণ করার নিরঙ্কুশ অধিকার কেবল এদেশের সাধারণ মানুষের।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) বিকেলে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত ‘আগ্রাসন বিরোধী পদযাত্রা’র অংশ হিসেবে এক জনাকীর্ণ উঠান বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। অত্যন্ত দৃঢ় ও সংবেদনশীল কণ্ঠে তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
বক্তব্যের শুরুতেই হাসনাত আব্দুল্লাহ বিগত দেড় দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সহযোগিতায় বিগত সরকার বাংলাদেশকে কার্যত একটি পরাধীন ভূখণ্ড হিসেবে পরিচালনা করার চেষ্টা করেছিল।
হাসনাত বলেন, “দিল্লি হাসিনাকে বাংলাদেশে এজেন্ট নিয়োগ করার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে এদেশকে একটি উপনিবেশ বা কলোনিয়াল স্টেটের মতো নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, বাংলাদেশ আর সেই অন্ধকার অতীতে ফিরে যাবে না। এদেশের মসনদে কে বসবে, তা দিল্লির ইচ্ছায় নয় বরং এদেশের মানুষের ব্যালটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।”
দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের ভূমিকার ওপর আলোকপাত করে হাসনাত আব্দুল্লাহ গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনের তিক্ত অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি অত্যন্ত পেশাদার ভঙ্গিতে মনে করিয়ে দেন যে, প্রশাসনের মূল দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক দল বিশেষের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা নয়। তিনি বলেন, “পুলিশ কিংবা প্রশাসনের কাজ ব্যালট পেপারে সিল মেরে জাল ভোট দিয়ে সরকার প্রতিষ্ঠা করা নয়।
বরং তাদের প্রধান এবং একমাত্র দায়িত্ব হলো এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে জনগণ নির্ভয়ে এবং নির্বিঘ্নে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন।” তিনি কর্মকর্তাদের সতর্ক করে বলেন যে, অতীতে নগ্নভাবে একটি বিশেষ দলকে ক্ষমতায় রাখতে গিয়ে নির্বাচন ব্যবস্থাকে কলুষিত করার ফল শুভ হয়নি। যারা জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে বেআইনি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবে, তাদের পরিণাম সাবেক বিতর্কিত কর্মকর্তাদের মতো হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এই ছাত্রনেতা ও সংগঠক বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে রয়েছে স্বাধীনতার চেতনা ও স্বনির্ভরতার পক্ষ, যারা দেশের আত্মমর্যাদা রক্ষা করতে চায়। অন্যদিকে রয়েছে সেই অপশক্তি, যারা বিদেশের গোলামি ও তাঁবেদারি করে ক্ষমতার স্বাদ নিতে চায়।
হাসনাত আব্দুল্লাহর মতে, একটি পক্ষ যখন চাঁদাবাজ, মাফিয়া এবং বিদেশি আধিপত্যবাদের হাত শক্ত করছে, তখন অন্য পক্ষটি আজাদি বা সত্যিকারের মুক্তির লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যারা ২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে রাজপথে রক্ত দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগকে অবজ্ঞা করে কিছু রাজনৈতিক দল পুনরায় বিদেশি প্রভুদের তোষণ শুরু করার পাঁয়তারা করছে। এমনকি যারা একসময় মুক্তিকামী মানুষদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে তকমা দিয়েছিল, এখন স্বার্থের খাতিরে তাদেরই অনেকে কাছে টেনে নিচ্ছে—যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
দেবিদ্বার পৌর জামায়াতের সেক্রেটারি ক্বারী মো. অলিউল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে স্থানীয় জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সভায় অন্যান্য বক্তারাও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণের রায় প্রতিষ্ঠায় রাজপথে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
তারা বলেন, কোনো অপশক্তি বা বিদেশি ষড়যন্ত্র যেন এদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে আর কখনও বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন উপজেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মো. শরীফুল ইসলাম, পৌর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ডা. গোলাম জিলানী ও স্থানীয় ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
সারগ্রাহী এই আলোচনার সমাপ্তি টেনে হাসনাত আব্দুল্লাহ সাধারণ ভোটারদের আশ্বস্ত করেন যে, নতুন বাংলাদেশে আর কোনো ভোট চুরির সংস্কৃতি মেনে নেওয়া হবে না। জনগণের প্রতিটি ভোট যেন পবিত্র আমানত হিসেবে গণ্য হয়, তা নিশ্চিত করতে তারা মাঠ পর্যায়ে আন্দোলন অব্যাহত রাখবেন। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে যেকোনো মূল্যে বিদেশি আধিপত্যবাদ রুখে দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।

