কৃষিজাত পণ্যের বাণিজ্যিকীকরণে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্যে আগামী ১২ ডিসেম্বর থেকে রাজধানীর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) শুরু হতে যাচ্ছে দুই দিনব্যাপী বৃহৎ পরিসরের ‘আলু উৎসব-২০২৫’। দেশের আলু শিল্পকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা এবং এই খাতের আধুনিকায়ন ও রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়ানোই এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য। এই গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনটির নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ), যা চলবে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) রাজধানীর পল্টনে বিসিএসএ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই উৎসবের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বিসিএসএ সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু, সিনিয়র সহ-সভাপতি ইশতিয়াক আহমেদ, সহ-সভাপতি মোহাম্মদ ইউনুছ এবং আয়োজক সহযোগী পোস্টমাস্টার কমিউনিকেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফায়জুল আলমসহ বিসিএসএর পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা এই উৎসবকে বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে অভিহিত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বাংলাদেশের আলু উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তারা জানান, উৎপাদন পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম এবং এশিয়া মহাদেশে তৃতীয় বৃহত্তম আলু উৎপাদনকারী দেশ। এই অর্জন বাংলাদেশের কৃষিখাতের সক্ষমতাকে নির্দেশ করে। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশাল উৎপাদন সত্ত্বেও আধুনিক কোল্ড-চেইন ব্যবস্থাপনা, প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, রপ্তানি-বান্ধব নীতিমালা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে এই খাত তার বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পুরোটা এখনও কাজে লাগাতে পারেনি। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আলু সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে নষ্ট হচ্ছে, যা কৃষক ও দেশের অর্থনীতি—উভয়কেই ক্ষতির সম্মুখীন করছে।
বিসিএসএ নেতারা আশা প্রকাশ করেন, আইসিসিবির হল–১-এ আয়োজিত এই দুই দিনব্যাপী ‘আলু উৎসব’ আলুর আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়াতে এক গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।
আলু উৎসব-২০২৫-কে কেবলমাত্র একটি প্রদর্শনী হিসেবে না দেখে, বরং এটিকে প্রযুক্তিগত বিনিময় এবং বাণিজ্যিক সংযোগের একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আয়োজকেরা নিশ্চিত করেছেন যে, এই প্রদর্শনীতে দেশি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের মোট ৬৬টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে।
এই প্রদর্শনীতে যেসব মূল বিষয়গুলো স্থান পাবে, তার মধ্যে রয়েছে—আলুর আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, উন্নত কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তি ও সমাধান, প্রক্রিয়াজাতকরণ কৌশল, খাদ্যপণ্যের মূল্য সংযোজন (Value Addition), রপ্তানি প্রক্রিয়া, কৃষিযন্ত্রপাতি, এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন সরবরাহ ব্যবস্থার মডেল। এছাড়াও আলু দিয়ে তৈরি নানান ধরনের খাদ্যপণ্যের স্টল থাকবে, যা ক্রেতা-দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
প্রদর্শনী ছাড়াও, এই উৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সংযোগ স্থাপন। এখানে আন্তর্জাতিক বিটুবি (বিজনেস-টু-বিজনেস) মিটিংয়ের আয়োজন করা হবে, যেখানে দেশি উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা সরাসরি বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি, প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময়ের জন্য সেমিনার এবং বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল সেশন অনুষ্ঠিত হবে। এই প্যানেল সেশনগুলোতে আলু শিল্পের সমস্যা, সম্ভাবনা এবং সমাধানের বিষয়ে গভীর আলোচনা হবে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এসব সেশন থেকে প্রাপ্ত সুপারিশমালাগুলো যাচাই-বাছাই করে দ্রুততার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, যাতে নীতি প্রণয়নে তা সহায়ক হয়।
বিসিএসএ নেতৃবৃন্দ মনে করেন, আলু উৎসবের মাধ্যমে যে প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক জ্ঞানের আদান-প্রদান হবে, তা বাংলাদেশের আলু শিল্পকে বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে সহায়ক হবে। আধুনিক কোল্ড-চেইন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে ফসলের অপচয় যেমন কমবে, তেমনি সংরক্ষিত আলু সারা বছর ধরে সরবরাহের মাধ্যমে বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। এটি কেবল কৃষকের আয় বৃদ্ধি করবে না, বরং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির উন্নয়ন হলে আলু থেকে চিপস, স্টার্চ বা অন্যান্য উচ্চ মূল্যের পণ্য তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে।
এই দুই দিনব্যাপী ‘আলু উৎসব-২০২৫’ বাংলাদেশের খাদ্য ও কৃষি শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য একটি বিশেষ বার্তা নিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে—আর তা হলো, ঐতিহ্যবাহী কৃষি উৎপাদনকে আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। এটিই হবে বাংলাদেশের আলু শিল্পের পূর্ণ সম্ভাবনা উন্মোচনের প্রথম দৃঢ় পদক্ষেপ।

