আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় স্মার্টফোন এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যোগাযোগ, পেশাগত কাজ, বিনোদন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ—সবকিছুই এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই অবারিত সুযোগের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষ করে দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের নানা জটিলতা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চক্ষু বিশেষজ্ঞদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সরাসরি চোখের স্থায়ী ক্ষতি না করলেও এটি দৃষ্টিশক্তির গুণমান এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ এবং বিস্তৃত সমস্যাটি হলো ‘ডিজিটাল আই স্ট্রেন’, যা বিশ্বজুড়ে ‘কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম’ নামেও পরিচিত। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোবাইল ফোনের ছোট ডিসপ্লেতে দীর্ঘক্ষণ নিবিষ্ট মনোযোগ দিয়ে কাজ করার সময় চোখের পেশীগুলো একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে স্থির থাকে। এই ক্রমাগত ফোকাস ধরে রাখার প্রক্রিয়ায় চোখের সূক্ষ্ম পেশীগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলে ব্যবহারকারী চোখের ক্লান্তি, তীব্র মাথাব্যথা এবং দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গে ভোগেন। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় পর হঠাৎ দূরের দিকে তাকালে দৃষ্টি বিভ্রম বা ‘ডাবল ভিশন’ তৈরি হতে পারে, যা কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি মনোযোগের বিঘ্ন ঘটায়।
ডিজিটাল আই স্ট্রেনের পাশাপাশি বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ‘ড্রাই আই’ বা শুষ্ক চোখ সিনড্রোম ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষের চোখের পলক প্রতি মিনিটে নির্দিষ্ট সংখ্যক বার পড়ে, যা চোখের উপরিভাগকে সিক্ত রাখে এবং প্রাকৃতিক লুব্রিকেন্ট হিসেবে কাজ করে। কিন্তু স্মার্টফোন বা ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার সময় চোখের পলক পড়ার হার স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এর ফলে চোখের প্রাকৃতিক অশ্রুস্তর দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং চোখে জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব কিংবা বালুকণা থাকার মতো অস্বস্তিকর অনুভূতির সৃষ্টি হয়। সময়মতো এর প্রতিকার না করা হলে দীর্ঘমেয়াদে এটি চোখের কর্নিয়ার ক্ষতি করতে পারে এবং স্বাভাবিক পড়াশোনা বা গাড়ি চালানোর মতো কাজগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
স্মার্টফোনের ক্ষতিকারক প্রভাব কেবল চোখের অস্বস্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সরাসরি মানুষের প্রাকৃতিক জীবনচক্র বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’কে প্রভাবিত করছে। স্মার্টফোনের স্ক্রিন থেকে নির্গত উচ্চ শক্তির দৃশ্যমান নীল আলো বা ‘ব্লু লাইট’ চোখের রেটিনার জন্য যেমন চাপদায়ক, তেমনি এটি মস্তিষ্কের মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণে বাধা দেয়। মেলাটোনিন হলো সেই হরমোন যা মানুষের ঘুমের চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে শরীর মনে করে এটি এখনো দিনের আলো, যার ফলে মেলাটোনিন উৎপাদন কমে যায় এবং অনিদ্রার সমস্যা তৈরি হয়। ঘুমের এই ঘাটতি পরোক্ষভাবে চোখের স্নায়ুগুলোকে দুর্বল করে দেয় এবং মানসিক অবসাদ বাড়িয়ে তোলে, যা সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক চক্ষুবিজ্ঞান সাময়িকীগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহারে সচেতনতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা ‘২০-২০-২০’ নিয়ম অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন, যার অর্থ হলো প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকা। এটি চোখের পেশীকে শিথিল করতে সাহায্য করে। এছাড়া স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা বা ব্রাইটনেস পারিপার্শ্বিক আলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা এবং ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা অপরিহার্য। আধুনিক স্মার্টফোনগুলোতে থাকা ব্লু-লাইট ফিল্টার বা নাইট মোড ব্যবহার করাও চোখের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
পরিশেষে, প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজতর করলেও এর অপব্যবহার যেন শারীরিক ক্ষতির কারণ না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি। স্মার্টফোনের নীল আলো আর ছোট স্ক্রিনের মায়াজাল থেকে চোখকে রক্ষা করতে নিয়মিত বিরতি এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। ভিটামিন এ, সি এবং ই সমৃদ্ধ খাবার চোখের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। ক্রমবর্ধমান এই ডিজিটাল যুগে চোখের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে কেবল চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে সচেতন জীবনযাপন এবং প্রযুক্তির পরিমিত ব্যবহারই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান। চোখের যেকোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে বিলম্ব না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানো বর্তমান সময়ের স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের জন্য বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
