দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটীয় আঙিনায় রাজনৈতিক অস্থিরতার কালো মেঘ আবারও ক্রীড়াঙ্গনের ওপর আছড়ে পড়েছে। আসন্ন ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) শুরুর আগেই বাংলাদেশের তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের জল্পনা ও বিতর্কের অবসান ঘটল। আজ শনিবার অত্যন্ত সংবেদনশীল এক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশনা জারি করেছে। কেন্দ্রীয় ক্রিকেট বোর্ডের এই নির্দেশের পরপরই কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, মুস্তাফিজুর রহমান আর তাদের স্কোয়াডের অংশ নন।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বেশ কিছু কট্টরপন্থী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের আইপিএলে অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছিল। বিশেষ করে মুস্তাফিজুর রহমানকে লক্ষ্য করে এই আন্দোলনের তীব্রতা ছিল অনেক বেশি। এই ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে আজ সকালে বিসিসিআইয়ের সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় মুস্তাফিজকে দল থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য কেকেআর ফ্র্যাঞ্চাইজিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইএসপিএন ক্রিকইনফোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বোর্ডের এই নির্দেশ পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কলকাতা ফ্র্যাঞ্চাইজি তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে।
কলকাতা নাইট রাইডার্স কর্তৃপক্ষের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিসিসিআইয়ের নির্দেশনা এবং অভ্যন্তরীণ চুলচেরা বিশ্লেষণের পর তারা মুস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে মুক্ত করে দেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আইপিএলের বিদ্যমান নীতিমালা অনুসারে বোর্ড কেকেআরকে মুস্তাফিজের পরিবর্তে অন্য কোনো বিদেশি ক্রিকেটারকে দলে নেওয়ার অনুমতি প্রদান করেছে। ফ্র্যাঞ্চাইজিটি আরও জানিয়েছে যে, খুব শীঘ্রই তারা বিকল্প খেলোয়াড়ের নাম ঘোষণা করবে। শাহরুখ খানের মালিকানাধীন দলটির জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ বোলিং আক্রমণের অন্যতম প্রধান ভরসা হিসেবে তারা এই কাটার মাস্টারকে বড় অংকে দলে ভিড়িয়েছিল।
বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, দেশজুড়ে সৃষ্ট অস্থিরতা ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে বোর্ড এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, কেকেআরকে একজন বিদেশি ক্রিকেটার ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং তারা মুস্তাফিজের বদলে তাদের পছন্দমতো যে কোনো খেলোয়াড়কে স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে কার্যত মুস্তাফিজের জন্য চলতি মৌসুমের আইপিএলের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।
অথচ কয়েক দিন আগেও চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রাথমিক পর্যায়ে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, দুই দেশের রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব খেলার মাঠে পড়বে না। ইনসাইডস্পোর্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একজন কর্মকর্তা বলেছিলেন যে, বাংলাদেশ ভারতের শত্রু রাষ্ট্র নয় এবং মুস্তাফিজের খেলার পথে কোনো আইনি বাধা নেই। কিন্তু কট্টরপন্থী সংগঠনগুলোর লাগাতার বিক্ষোভ এবং সরাসরি হুমকির মুখে বিসিসিআই শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশের বিজেপি নেতা সঙ্গীত সোমের মতো ব্যক্তিদের কড়া হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে। তিনি সরাসরি শাহরুখ খানকে উদ্দেশ্য করে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন এবং মুস্তাফিজকে ভারতের মাটিতে নামতে না দেওয়ার হুমকি দেন।
উল্লেখ্য, এবারের আইপিএল নিলামে রেকর্ড ৯ কোটি ২০ লক্ষ রুপিতে মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে নিয়েছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স। এটি ছিল আইপিএল ইতিহাসে কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারের জন্য সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক। ৩০ বছর বয়সী এই বাঁহাতি পেসার এর আগে আইপিএলের আটটি আসরে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন দলের হয়ে মাঠ মাতিয়েছেন। সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ থেকে শুরু করে দিল্লি ক্যাপিটালস বা চেন্নাই সুপার কিংসের জার্সিতে তার পারফরম্যান্স ছিল ঈর্ষণীয়। কিন্তু মাঠের বাইরের রাজনৈতিক মেরুকরণ এবার তার পেশাদার ক্যারিয়ারে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল।
এই সিদ্ধান্তটি নিয়ে ভারতের ক্রীড়ামহলেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ভারতের অনেক সাবেক ক্রিকেটার ও বিশ্লেষক ক্রিকেটের সাথে রাজনীতিকে মিশিয়ে ফেলার এই প্রবণতার সমালোচনা করেছেন। শশী থারুরের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সাবেক ক্রিকেটার মোহাম্মদ কাইফও মুস্তাফিজের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তবে মাঠের উত্তেজনার চেয়ে যখন রাজপথের উত্তেজনা বড় হয়ে দেখা দেয়, তখন শেষ পর্যন্ত খেলাকেই হার মানতে হয়—মুস্তাফিজের এই ঘটনাটি তারই একটি উজ্জ্বল নজির হয়ে রইল। মুস্তাফিজের মতো একজন বিশ্বমানের বোলারকে হারিয়ে কেকেআর তাদের বোলিং শক্তি নিয়ে এখন নতুন করে ভাবছে, অন্যদিকে বাংলাদেশি সমর্থকদের মধ্যে এই ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
