আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসনে এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্রে মৃত ব্যক্তির স্বাক্ষর পাওয়া যাওয়ার মতো এক নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম ও সই ব্যবহারের দায়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ আশরাফ ছিদ্দিকির মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। আজ শুক্রবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই কার্যক্রমের সময় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটারের ১ শতাংশের স্বাক্ষরযুক্ত সমর্থন তালিকা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। মোহাম্মদ আশরাফ ছিদ্দিকির দাখিল করা সেই তালিকায় একজন মৃত ব্যক্তির নাম ও স্বাক্ষর পাওয়া যায়। নির্বাচন কমিশনের মাঠ পর্যায়ের তদন্তে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর রিটার্নিং কর্মকর্তা বিধি মোতাবেক তাঁর প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন। কেবল মৃত ব্যক্তির স্বাক্ষরই নয়, দ্বৈবচয়ন বা র্যান্ডম সিলেকশনের ভিত্তিতে বাছাই করা ১০ জন ভোটারের মধ্যে ৮ জনই জানিয়েছেন যে, তাঁরা ওই প্রার্থীর তালিকায় কোনো স্বাক্ষর করেননি। অর্থাৎ স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়টিও এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
একই দিনে অনুষ্ঠিত এই যাচাই-বাছাই কার্যক্রমে আরও দুই প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিদ্রোহী প্রার্থী শহিদুল ইসলাম চৌধুরী। দলীয় মনোনয়ন বা ধানের শীষ প্রতীকের বৈধ কাগজপত্র দাখিল করতে না পারায় তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। অন্যদিকে, জাতীয় পার্টির (জাকের) মনোনীত প্রার্থী মোহা. এরশাদ উল্ল্যা নিজেই নিজের প্রস্তাবকারী হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্ত করায় নির্বাচনী বিধিমালা লঙ্ঘনের দায়ে তাঁর মনোনয়নটিও অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, প্রার্থীর বাইরে অন্য কোনো ভোটারকে প্রস্তাবকারী হিসেবে থাকতে হয়, যা এক্ষেত্রে মানা হয়নি।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, আজ সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত অত্যন্ত নিবিড়ভাবে মনোনয়নপত্রের তথ্য ও নথিপত্র যাচাই করা হয়েছে। তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রতিটি তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করা হয়েছে। যাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে, তারা আগামী ৪ জানুয়ারির পরবর্তী চার কার্যদিবসের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে আপিল করার সুযোগ পাবেন।”
চট্টগ্রাম-১ আসনে নির্বাচনী লড়াইয়ের জন্য মোট ১৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন, যার মধ্যে ১০ জন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা জমা দেন। আজকের যাচাই-বাছাই শেষে সাতজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ বলে ঘোষিত হয়েছে। তাঁরা হলেন:
নুরুল আমিন (বিএনপি), সৈয়দ শাহাদাত হোসেন (জাতীয় পার্টি), মোহাম্মদ ছাইফুর রহমান (জামায়াতে ইসলামী), শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী (বাংলাদেশ মুসলিম লীগ), এ কে এম আবু ইউসুফ (জেএসডি), রেজাউল করিম (ইনসানিয়াত বিপ্লব), ফেরদৌস আহমদ চৌধুরী (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ)।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি এবং পরদিন ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। মীরসরাইয়ের এই আসনটিতে হেভিওয়েট প্রার্থীদের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নে এমন জালিয়াতির ঘটনা ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে মৃত মানুষের স্বাক্ষর দিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টিকে নির্বাচনী আইনের প্রতি চরম অবজ্ঞা হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল। এখন দেখার বিষয়, আপিল বিভাগে এই বাদ পড়া প্রার্থীরা তাঁদের প্রার্থিতা ফিরে পেতে সফল হন কি না।

