ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা জানুয়ারি। সারা বিশ্বে যখন নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার উৎসবে মেতে ওঠে মানুষ, বাংলাদেশে তখন দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট—সবখানেই এই তারিখে জন্মদিনের এক বিশাল আধিক্য চোখে পড়ে।
মনে হতে পারে, দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্ম বুঝি এই বছরের প্রথম দিনেই হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কি একই দিনে এত মানুষের জন্ম হওয়া সম্ভব? নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কোনো সামাজিক ও প্রশাসনিক অভ্যাস? এই কৌতূহল মেটাতে অনুসন্ধান চালিয়ে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে মিলেছে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ও বাস্তবসম্মত তথ্য।
বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট এমনকি ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ১ জানুয়ারি জন্ম তারিখ হিসেবে ব্যবহার করার এক ব্যাপক প্রবণতা দেখা যায়। জনশুমারি বা বিভিন্ন জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের তথ্যেও এই তারিখটির প্রাধান্য লক্ষ্যণীয়। শিশুদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো দৈব ঘটনা বা অলৌকিক বিষয় নয়; বরং দেশের জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সচেতনতার অভাবই এর মূল কারণ।
বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞ ড. ইশতিয়াক মান্নান এই প্রবণতা সম্পর্কে বলেন, বিষয়টি এমন নয় যে জানুয়ারি মাসের এক তারিখে প্রাকৃতিকভাবেই দেশে বেশি সংখ্যক শিশুর জন্ম হচ্ছে। আসল কারণটি লুকিয়ে আছে আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে।
বাংলাদেশে এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুর জন্ম হয় বাড়িতে, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব সেবা পৌঁছাতে পারেনি। এই এলাকাগুলোতে শিক্ষার হার অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় অভিভাবকরা সন্তানের সঠিক জন্ম তারিখ সংরক্ষণ বা তাৎক্ষণিক নিবন্ধনের বিষয়ে খুব একটা সচেতন নন।
তিনি আরও জানান, সঠিকভাবে জন্ম তারিখ নিবন্ধিত না হওয়ার ফলে যখন ওই শিশুটি বড় হয়ে প্রথমবারের মতো স্কুলে ভর্তি হতে যায় কিংবা সার্টিফিকেট পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের প্রয়োজন পড়ে, তখন সমস্যার শুরু হয়। যেহেতু মা-বাবার কাছে সঠিক তারিখের প্রমাণ থাকে না, তাই অনেক ক্ষেত্রে স্কুল কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরাই নিজেদের সুবিধামতো একটি তারিখ বসিয়ে দেন।
সহজে মনে রাখার সুবিধার্থে এই ‘কমন’ তারিখটি সাধারণত বছরের প্রথম দিন বা ১ জানুয়ারি হয়ে থাকে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে হাজার হাজার মানুষের জন্মদিন একই তারিখে নথিভুক্ত হয়ে যায়। এ কারণেই বাংলাদেশে অনেকেরই দুটি করে জন্মদিন থাকে—একটি সার্টিফিকেট বা দাপ্তরিক নথিতে, অন্যটি পারিবারিকভাবে উদযাপিত প্রকৃত জন্মদিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা কেবল বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল এবং এমনকি আফগানিস্তান ও ভিয়েতনামেও একই ধরনের চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেখানে সঠিক ও স্বয়ংক্রিয় জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থার অনুপস্থিতি রয়েছে, সেখানে ১ জানুয়ারি বা ১ জুলাইয়ের মতো তারিখগুলো দাপ্তরিক নথিতে বেশি ব্যবহার করা হয়।
তবে ড. ইশতিয়াক মান্নান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করে বলেন, সব জন্ম তারিখই যে বানানো, তা কিন্তু নয়। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রসারের ফলে এখন প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বেড়েছে এবং প্রতি বছর ১ জানুয়ারি বাংলাদেশে সত্যি সত্যিই অনেক শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে এই তারিখে যাদের জন্মদিন, তাদের মধ্যে একটি অংশ যেমন দাপ্তরিক প্রয়োজনে তৈরি করা, তেমনি একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রকৃত অর্থেই বছরের প্রথম দিনে জন্ম নেওয়া শিশু।
বিগত কয়েক বছর ধরে সরকার জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও বাধ্যতামূলক করার ফলে এই প্রবণতা ধীরে ধীরে কমে আসছে। বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের সঠিক জন্ম তারিখ ও সময় এখন ডিজিটাল ডেটাবেজে সংরক্ষিত হচ্ছে। তবে পুরোনো প্রজন্মের মধ্যে ১ জানুয়ারি যে এক অনন্য ও সাধারণ জন্ম তারিখ হিসেবে রাজত্ব করবে, তা বলাই বাহুল্য। মূলত সচেতনতার অভাব আর প্রশাসনিক জটিলতা এড়িয়ে চলার সহজ উপায় হিসেবেই ১ জানুয়ারি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের অঘোষিত ‘জাতীয় জন্মদিন’।
