বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের অভূতপূর্ব সমাগমকে তার প্রতি জনগণের অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতিফলন হিসেবে অভিহিত করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) বিকেলে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। মির্জা ফখরুল বলেন, বেগম জিয়ার বিদায়ে দেশজুড়ে যে শোকের লহরী বয়ে যাচ্ছে, তা প্রমাণ করে তিনি বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীর আসন গেড়েছিলেন।
জানাজা চলাকালীন রাজধানীর রাজপথ ছাড়িয়ে আশপাশের ভবনের ছাদেও মানুষের উপস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনোই নিজের আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে মাথানত করেননি। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তিনি যে আপসহীন ভূমিকা পালন করেছেন, তা আজ কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর কারাভোগ, গৃহবন্দিত্ব এবং গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি কখনোই দেশ ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করেননি। মাটির প্রতি তার এই অদম্য টান এবং দেশের মানুষের প্রতি তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই আজ লক্ষ লক্ষ মানুষকে শোকাতুর করেছে।
মির্জা ফখরুল আরও বলেন, জাতি যখন এক চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, তখন বেগম জিয়ার মতো একজন অভিজ্ঞ ও দূরদর্শী অভিভাবকের প্রস্থান এক অপূরণীয় ক্ষতি। দেশের মানুষ আজ মর্মাহত কারণ তারা তাদের সবচেয়ে প্রিয় নেত্রীকে হারিয়েছে। জানাজায় মানুষের চোখের পানি কেবল শোকের প্রকাশ নয়, বরং এটি তার রেখে যাওয়া আদর্শের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা। তিনি বিশ্বাস করেন, বেগম খালেদা জিয়ার এই বিদায় দেশের প্রতিটি নাগরিককে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নতুন করে উদ্বুদ্ধ করবে। আগাম নির্বাচনে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ পরিবেশ নিশ্চিত করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শক্তিকে বিজয়ী করার মাধ্যমেই নেত্রীর প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান জানানো হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাবা, মা ও ভাইকে হারিয়ে শোকবিহ্বল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের যে দর্শন দিয়ে গেছেন, বেগম খালেদা জিয়া সেই পতাকাকে সারা দেশে সমুন্নত রেখেছিলেন। এখন সেই উত্তরাধিকারের মশাল বহন করার গুরুদায়িত্ব তারেক রহমানের ওপর অর্পিত হয়েছে। এটি কেবল তার পরিবারের দায়িত্ব নয়, বরং বিএনপির প্রতিটি স্তরের নেতাকর্মীর নৈতিক কর্তব্য। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, তারেক রহমান জনগণের সমর্থন নিয়ে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং হারানো গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন।
আসন্ন নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি দলের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে মির্জা ফখরুল অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, ফলাফল হবে সম্পূর্ণ উল্টো। ম্যাডামের চলে যাওয়া দেশের মানুষের মধ্যে এক প্রবল আবেগ ও সহমর্মিতার সৃষ্টি করেছে। এই আবেগ বিএনপিকে রাজপথে এবং ভোটের ময়দানে আরও বেশি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করবে। নেত্রীর অভাব পূরণে দল এখন অনেক বেশি সংকল্পবদ্ধ। সাধারণ মানুষের এই বিপুল সমর্থন ও ভালোবাসাই বিএনপিকে আগামীর লক্ষ্য অর্জনে পরম শক্তি জোগাবে।
উল্লেখ্য, গত ৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর থেকেই বিএনপির রাজনীতিতে এক নতুন আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই বক্তব্য মূলত দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং সাধারণ মানুষের সেন্টিমেন্টকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। নতুন বছরের প্রথম দিনে মির্জা ফখরুলের এই সাহসী অবস্থান দলের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনারই একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করে।

