বাংলাদেশের রাজনীতির অবিসংবাদিত নেত্রী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে আজ সমগ্র দেশে গভীর শোক ও বিষাদঘন পরিবেশ বিরাজ করছে। আজ মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তাঁর ইন্তেকালের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রিয় নেত্রীকে হারানোর বেদনায় মুহ্যমান বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ দিনভর কুরআন খতম, দোয়া মাহফিল ও শোকসভার মাধ্যমে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন।
বগুড়ায় শোকের ঢল বেগম খালেদা জিয়ার শ্বশুরবাড়ি এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পৈতৃক ভিটা বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী জনপদে আজ যেন কান্নার রোল পড়েছে। সকাল থেকেই গাবতলীসহ আশপাশের এলাকায় শোকাতুর মানুষের ঢল নামে। জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা এক শোকবার্তায় বলেন, “আজ আমরা কেবল আমাদের রাজনৈতিক অভিভাবককেই হারাইনি, বরং হারিয়েছি গণতন্ত্র ও দেশের সার্বভৌমত্বের ঐক্যের প্রতীককে।” বগুড়া জেলা বিএনপির কার্যালয়ে আজ কালো পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং দিনভর কুরআন তেলাওয়াত ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
পিরোজপুর ও দক্ষিণ জনপদ পিরোজপুরে জেলা বিএনপির কার্যালয়ে সকাল থেকেই শোকাতুর নেতাকর্মীরা জমায়েত হন। জেলা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, খালেদা জিয়ার প্রয়াণে পুরো জাতি আজ অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। এদিকে, ছারছীনা শরীফের পীর ও জমিয়াতে হিযবুল্লাহর আমির আলহাজ্ব মাওলানা মুফতী শাহ্ আবু নছর নেছারুদ্দীন আহমদ হুসাইন এক শোকবার্তায় বেগম জিয়াকে একজন দৃঢ়চেতা ও আপসহীন নেত্রী হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর নির্দেশে দেশের তিন হাজারেরও বেশি দ্বীনিয়া মাদ্রাসায় মরহুমার জন্য বিশেষ কুরআন খতম ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সারাদেশে শোকের প্রতিফলন সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, ভোলা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। সিরাজগঞ্জে নেতাকর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করে শোক মিছিলে অংশ নেন। ময়মনসিংহে নতুন বাজারস্থ বিএনপি কার্যালয়ে দোয়া মাহফিলে নেতারা বলেন, দেশের চরম ক্রান্তিলগ্নে বেগম জিয়ার অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ভোলায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে দিনভর কুরআন খতমের আয়োজন করা হয়। জেলা বিএনপির নেতারা বলেন, খালেদা জিয়া মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ দেশের মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে গেছেন।
রাজশাহী ও রংপুরে উত্তাল শোক রাজশাহী মহানগর বিএনপির কার্যালয়ে নেতাকর্মীরা তাঁদের প্রিয় নেত্রীর বিদায়ে অঝোরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মাদ্রাসার এতিম শিশুদের নিয়ে সেখানে বিশেষ ভোজ ও দোয়ার আয়োজন করা হয়। রংপুরের গ্র্যান্ড হোটেল মোড়স্থ দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। মাইকযোগে শহরজুড়ে কুরআন তেলাওয়াত প্রচার করা হয়। জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতারা বলেন, “বেগম জিয়ার মৃত্যুতে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হলো, তা অপূরণীয়। তিনি ছিলেন আমাদের শক্তির মূল উৎস।”
প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শোক রাজবাড়ী ও চাঁদপুরেও দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় এবং শোকবই খোলা হয়। ঝিনাইদহে নেতাকর্মীরা কালো পতাকা হাতে মৌন মিছিল করেন। রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরেও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠন শোক প্রকাশ করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান এক শোকবার্তায় বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একজন মহান রাষ্ট্রনায়ক, যাঁর আদর্শ ও ত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
উল্লেখ্য, গত ৪০ দিন ধরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে আজ সকালে ৮০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহীয়সী নারী। তাঁর মৃত্যুতে সরকার ইতোমধ্যে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং আগামীকাল ৩১ ডিসেম্বর (বুধবার) দেশজুড়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। আগামীকাল বাদ জোহর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে এবং পরবর্তীতে শেরে বাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।

