তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দুর্ঘটনাটি ঘটে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার নীলকমল ইউনিয়নের বাংলাবাজার এলাকায়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে ‘এমভি অ্যাডভেঞ্চার-৯’ লঞ্চটি ঝালকাঠির উদ্দেশ্যে ফিরছিল।
রাত ২টার দিকে ভোলার ঘোষেরহাট থেকে ঢাকাগামী ‘এমভি জাকির সম্রাট-৩’ লঞ্চের সঙ্গে অ্যাডভেঞ্চার-৯-এর ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। মাঝনদীতে এই সংঘর্ষের ফলে জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চের চারজন যাত্রী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। নৌ-চলাচলের নিয়ম লঙ্ঘন ও প্রাণহানির দায়ে বিআইডব্লিউটিএ তাৎক্ষণিকভাবে এমভি অ্যাডভেঞ্চার-৯ এবং এমভি জাকির সম্রাট-৩—এই দুটি লঞ্চেরই রুট পারমিট বাতিল ঘোষণা করেছে।
অন্যদিকে, একই রাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে দ্বিতীয় দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঢাকা-বরিশাল রুটের অন্যতম বিশাল যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘সুন্দরবন-১৬’ একটি বালুবাহী বাল্কহেডকে সজোরে ধাক্কা দেয়। লঞ্চের প্রবল ধাক্কায় বাল্কহেডটি মুহূর্তের মধ্যে নদীতে তলিয়ে যায়।
এ ঘটনার পর নিখোঁজ দুই শ্রমিকের মরদেহ শুক্রবার বিকেলে নদী থেকে উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। নিহতরা হলেন পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার শাকিল আহমেদ (২৪) এবং ঝালকাঠির রাজাপুরের মোহাম্মদ হাসান (২০)। তারা দুজনই ওই বাল্কহেডে লস্কর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দুর্ঘটনার পর নৌ-পুলিশ সুন্দরবন-১৬ লঞ্চটি জব্দ করে এর স্টাফদের হেফাজতে নিয়েছে এবং বিআইডব্লিউটিএ লঞ্চটির রুট পারমিট বাতিল করেছে।
বরিশাল বিআইডব্লিউটিএ-র ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. জুলফিকার জানিয়েছেন, নৌ-পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা এবং চালকদের অসতর্কতার কারণে মূল্যবান প্রাণহানির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, “প্রাথমিক তদন্তে ত্রুটি পাওয়ায় অ্যাডভেঞ্চার-৯, সুন্দরবন-১৬ এবং এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চের চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিয়মিত রুট পারমিট বাতিলের পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।”
এদিকে, দুর্ঘটনার সঠিক কারণ ও দায়ীদের চিহ্নিত করতে বিআইডব্লিউটিএ-র পক্ষ থেকে একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নৌ-বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতের আঁধারে বেপরোয়া গতিতে লঞ্চ চালানো এবং ফগ লাইট বা রাডারের সঠিক ব্যবহার না করার ফলেই এ ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে।
বরিশাল অঞ্চলের নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা দক্ষিণবঙ্গের মানুষের প্রধান ভরসা হলেও সাম্প্রতিক এই দুর্ঘটনাগুলো সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় লঞ্চগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন এবং চালকদের অদক্ষতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। বরিশাল নদী বন্দরে নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীরা দাবি তুলেছেন, কেবল রুট পারমিট বাতিল নয়, বরং স্থায়ীভাবে নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হোক।
মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারে এখন শোকের মাতম চলছে। নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিআইডব্লিউটিএ-র এই কঠোর পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও, ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীরা আইনের আওতায় আসে কি না এবং ভবিষ্যতে নৌ-পথ নিরাপদ করতে আরও কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

