বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে জেলা প্রশাসন। আদালতের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ও পরিবেশগত আইন অমান্য করে সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে নির্মিত একটি বিশালাকার অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বিকেলে প্রশাসনের এই কড়া বার্তার পর নির্মাণকাজে জড়িত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ব্র্যান্ড সলিউশন লিমিটেড’ তড়িঘড়ি করে তাদের স্থাপনাসমূহ সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে।
সূত্র মতে, কক্সবাজার সৈকতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জনাকীর্ণ সুগন্ধা পয়েন্টে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিমানের বিশাল প্রতিকৃতি সদৃশ একটি অস্থায়ী স্থাপনা তৈরি করেছিল উক্ত প্রতিষ্ঠানটি। সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ আইনত দণ্ডনীয় হলেও রাতের আঁধারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল তারা। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যম ও অনলাইন পোর্টালে ‘কক্সবাজার সৈকতে রাতের আঁধারে চলছে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ’ শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। গণমাধ্যমে খবরটি ব্যাপক আলোচিত হলে নড়েচড়ে বসে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসন সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং বিদ্যমান পরিবেশগত শর্তাবলি লঙ্ঘন করে এই স্থাপনাটি তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) এ ধরনের কোনো অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ নেই। ফলে নিয়ম ভঙ্গের দায়ে স্থাপনাটি দ্রুত অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে ব্র্যান্ড সলিউশন লিমিটেডের পরিচালক ইরশাদুল হক জানান, প্রশাসনের নির্দেশের পর তাদের আর কিছু করার নেই। সরকারি আদেশ মেনে তারা স্থাপনাটি সরিয়ে নিচ্ছেন।
প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে স্থানীয় ও জাতীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। পরিবেশ সংগঠন ‘ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি’ (ইয়েস)-এর প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, “সৈকতের বালিয়াড়ি একটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। এখানে যেকোনো ধরনের স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ পরিবেশের জন্য চরম হুমকি। প্রশাসন শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থা নেওয়ায় আমরা সাধুবাদ জানাচ্ছি। তবে ভবিষ্যতে যেন কেউ আর এমন দুঃসাহস দেখাতে না পারে, সে জন্য কঠোর তদারকি ও স্থায়ী নজরদারি প্রয়োজন।”
উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে সরকার কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার ৪৬৫ হেক্টর এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে। এই ঘোষণার মূল লক্ষ্য ছিল সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য, নীল জলরাশি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, কক্সবাজারের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফের বদর মোকাম পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার সৈকত জুড়ে ৩০০ মিটার পর্যন্ত উন্নয়ন নিষিদ্ধ এলাকা এবং ৫০০ মিটার পর্যন্ত সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট আদেশ অনুযায়ী, এই সীমানার ভেতর যেকোনো ধরনের পাকা বা কাঁচা অবকাঠামো নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমনের সুযোগ নিয়ে অনেক সময় বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করে বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরির চেষ্টা চালায়। তবে সুগন্ধা পয়েন্টের এই উচ্ছেদ অভিযান পর্যটন নগরীর পরিবেশ রক্ষায় একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সৈকতের আদি রূপ ধরে রাখতে প্রশাসনের এমন আপসহীন ভূমিকা অব্যাহত রাখা জরুরি।

