প্রকৃতি আমাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে ঋতুভেদে হরেক রকমের ফল উপহার দেয়। এই তালিকায় আঙুর অন্যতম একটি জনপ্রিয় এবং পুষ্টিকর ফল হিসেবে পরিচিত। চমৎকার স্বাদ এবং উচ্চ পুষ্টিমানের কারণে বিশ্বজুড়ে এই ফলের কদর রয়েছে। বাজারে সাধারণত দুই ধরনের আঙুর সবচেয়ে বেশি দেখা যায়— সবুজ ও লাল। ছোট এই রসালো ফলটি ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর।
তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি চিরাচরিত প্রশ্ন প্রায়ই দেখা যায়: পুষ্টিগুণের বিচারে লাল নাকি সবুজ— কোন আঙুরটি স্বাস্থ্যের জন্য বেশি ফলদায়ক? আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান এবং গবেষণার আলোকে এই দুই ধরনের ফলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু আকর্ষণীয় তথ্য উঠে আসে।
মূলত দুই রঙের আঙুরই শরীরকে সজীব রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। উভয় প্রকার আঙুরই প্রাকৃতিক শর্করা, জলীয় অংশ, ভিটামিন সি এবং ভিটামিন কে-এর সমৃদ্ধ উৎস। ক্যালরি বা তন্তু বা ফাইবারের পরিমাণের দিক থেকেও এদের মধ্যে খুব বড় কোনো ব্যবধান নেই। তবে এদের রঙের ভিন্নতাই মূলত নির্দেশ করে যে, কোনটিতে কোন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বেশি বিদ্যমান। রঙের এই তফাতই এদের কার্যকারিতার ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য তৈরি করে দেয়।
পুষ্টিবিদদের মতে, সবুজ আঙুরের চেয়ে লাল আঙুর স্বাস্থ্যের বিচারে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো লাল আঙুরের খোসায় থাকা ‘রেসভেরাট্রল’ নামক একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই উপাদানটি মূলত লাল বা গাঢ় রঙের আঙুরকে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
রেসভেরাট্রল হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় এক অভাবনীয় ভূমিকা পালন করে। এটি রক্তনালীর নমনীয়তা বজায় রাখে এবং রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। নিয়মিত লাল আঙুর গ্রহণ করলে শরীরে ক্ষতিকারক কোলেস্টেরলের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়, যা পরোক্ষভাবে স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে আনে।
লাল আঙুরের আরও একটি চমৎকার গুণ হলো এর বার্ধক্য প্রতিরোধী ক্ষমতা। এতে থাকা ফাইটোকেমিক্যালস কোষের ক্ষয় রোধ করে এবং ত্বকের সজীবতা বজায় রাখে। দীর্ঘায়ু লাভে এবং তারুণ্য ধরে রাখতে লাল আঙুরের ভূমিকা বিজ্ঞানসম্মতভাবে স্বীকৃত। এছাড়া মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষায়ও এটি কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে, লাল আঙুরে থাকা উপাদানগুলো মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে স্মৃতিশক্তি এবং চিন্তাশক্তিকে সচল রাখতে সহায়তা করে।
অন্যদিকে, সবুজ আঙুরও গুণের দিক থেকে পিছিয়ে নেই। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ‘ফ্ল্যাভোনয়েডস’, যা শরীরকে ভেতর থেকে সুরক্ষিত রাখে। সবুজ আঙুরে ভিটামিন কে-এর উপস্থিতি হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখতে এবং হাড় মজবুত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যারা হাড়ের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য সবুজ আঙুর একটি চমৎকার প্রাকৃতিক পথ্য। এছাড়া এতে থাকা ‘কোয়ারসেটিন’ নামক উপাদান শরীরের যেকোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ প্রদাহ বা জ্বালাপোড়া কমাতে সাহায্য করে। এমনকি অ্যালার্জিজনিত সমস্যা প্রতিরোধেও সবুজ আঙুর বেশ কার্যকর।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, আপনি যদি হৃদযন্ত্রের সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী কোষীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চান, তবে লাল বা কালো আঙুর আপনার জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সবুজ আঙুর কম গুরুত্বপূর্ণ। পুষ্টির বিচারে যেকোনো রঙের আঙুরই আপনার দৈনিক সুষম খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দাবি রাখে। শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা থেকে শুরু করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো পর্যন্ত উভয় ফলই সমানভাবে কাজ করে।
পরিশেষে, আঙুরের বর্ণ যা-ই হোক না কেন, নিয়মিত ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। ঋতুভিত্তিক সতেজ আঙুর বেছে নিয়ে আপনি আপনার শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করতে পারেন। তাই স্বাদ এবং সহজলভ্যতা অনুযায়ী আপনার পছন্দের আঙুরটি খাদ্যতালিকায় রাখুন এবং সুস্থ জীবনের পথে এক ধাপ এগিয়ে যান।
