একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটন এখন আর কেবল বিনোদন বা ভ্রমণের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থা (UNWTO)-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পর্যটন খাত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল শিল্প, যা উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় অঞ্চলের জিডিপিতে অভাবনীয় অবদান রাখছে।
২০২৪ সালের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালেও এই খাতের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে, যা মহামারি পরবর্তী স্থবিরতা কাটিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যে এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪৫ কোটি, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১১.৫ শতাংশ বেশি এবং ২০২৫ সালের প্রাথমিক প্রান্তিকগুলোতেও এই ধারা ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
চলতি ২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের মোট অবদান প্রায় ১১.৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্ব জিডিপির আনুমানিক ১০.৩ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান ২০১৯ সালের প্রাক-মহামারি পর্যায়ের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। কেবল আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ব্যয় থেকেই এই বছর প্রায় ২.১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
এই বিশাল আর্থিক প্রবাহ সরাসরি আবাসন, খাদ্য সরবরাহ, পরিবহন, বিনোদন এবং খুচরা বিপণন খাতের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, পর্যটনবান্ধব দেশ জাপানে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ বিদেশি পর্যটকের সমাগম হয়েছে, যা দেশটির পূর্ববর্তী সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। একইভাবে স্পেনে ২০২৪ সালে ৯ কোটি ৪০ লাখ পর্যটকের আগমন এবং ১২৬ বিলিয়ন ইউরো আয় দেশটির জিডিপিকে ১২.৩ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে।
পর্যটন শিল্পের অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো এর শ্রমঘন প্রকৃতি, যা বিপুল পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সক্ষম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৭ কোটি মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই খাতের সাথে যুক্ত থাকবেন। সহজভাবে বললে, বিশ্বের প্রতি ১০ জন কর্মজীবী মানুষের মধ্যে অন্তত ১ জন পর্যটন সংশ্লিষ্ট পেশায় নিয়োজিত।
এই খাতের মাধ্যমে হোটেল ও রিসোর্ট কর্মী, ট্যুর গাইড এবং ট্রাভেল এজেন্টের মতো সরাসরি কর্মসংস্থানের পাশাপাশি কৃষি, ক্ষুদ্র কুটির শিল্প এবং নির্মাণ খাতের মতো পরোক্ষ ক্ষেত্রগুলোতেও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে পর্যটন এখন প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে, যেখানে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ পর্যটকের আগমনে স্থানীয় খুচরা ব্যবসা ও বন্দর কেন্দ্রিক বাণিজ্যে গতি ফিরেছে।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও পর্যটন খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পর্যটকরা যখন তাদের স্থানীয় মুদ্রা যেমন ডলার বা ইউরো কোনো দেশে ব্যয় করেন, তখন সংশ্লিষ্ট দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হয়। এটি বাণিজ্যের ঘাটতি কমাতে এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে সহায়তা করে। মালদ্বীপ এর একটি আদর্শ উদাহরণ, যেখানে দেশটির অর্থনীতির প্রধান ভিত্তিই হলো পর্যটন থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতও ২০২৪ সালে পর্যটন থেকে প্রায় ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে নিজের অবস্থানকে সুসংহত করেছে। অন্যদিকে, চীন তাদের বিশাল অভ্যন্তরীণ পর্যটন বাজারকে ব্যবহার করে খুচরা বিক্রয় ও পরিবহন শিল্পে ১.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অবদান নিশ্চিত করছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি শিক্ষণীয় মডেল।
রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রাজস্ব বৃদ্ধিতে পর্যটন শিল্পের অবদানও অপরিসীম। সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে ভ্যাট, আবাসন কর, বিমানবন্দর ফি এবং লাইসেন্স ফি’র মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ পায়, তা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা সম্ভব হয়। থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো এই রাজস্ব ব্যবহার করে তাদের সড়ক, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উন্নয়ন ঘটাচ্ছে।
পর্যটন কেন্দ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে শুধুমাত্র পর্যটকরাই নয়, বরং স্থানীয় জনগণও উন্নত বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ এবং টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধা ভোগ করে। বাংলাদেশের সিলেট বা নেপালের পাহাড়ি গ্রামগুলোর উদাহরণ দিলে দেখা যায়, পর্যটনের কারণে দুর্গম এলাকাগুলোতেও আধুনিক রাস্তাঘাট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যা গ্রাম থেকে শহরমুখী অভিবাসন কমিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করছে।
তবে বৈশ্বিক এই জোয়ারের বিপরীতে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অবস্থা এখনো আশানুরূপ নয়। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের এই সম্ভাবনাটি অনেকটাই অপূর্ণ রয়ে গেছে। অথচ কক্সবাজারের বিশাল সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন কিংবা সিলেটের পাহাড় ও চা বাগানকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশও হতে পারতো দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান পর্যটন কেন্দ্র।
এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রথমেই একটি আধুনিক ও সমন্বিত জাতীয় পর্যটন নীতি প্রণয়ন করা জরুরি। যেখানে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ বিনিয়োগের স্পষ্ট পথরেখা থাকবে। বিশেষ করে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটন এলাকায় পর্যটক পুলিশের উপস্থিতি জোরদার করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও ডিজিটাল অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা রাখা একান্ত প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে এই পর্যটন শিল্প। তবে এর জন্য শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ওপর নির্ভর না করে ‘পণ্য বৈচিত্র্যকরণ’ বা ডাইভারসিফিকেশনের দিকে নজর দিতে হবে। ইকো-ট্যুরিজম, হেরিটেজ ট্যুরিজম, এবং চিকিৎসা পর্যটনের মতো নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করা সহজ হবে।
সেই সাথে ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের আতিথেয়তার প্রচার বাড়াতে হবে। পর্যটন সংশ্লিষ্ট খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলোর মানোন্নয়ন করা হলে তা দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল কর্মসংস্থানের বাজার উন্মুক্ত করবে।
পরিশেষে, টেকসই ব্যবস্থাপনা ও সঠিক পরিকল্পনার সমন্বয়ে পর্যটনকে এগিয়ে নিতে পারলে এটি কেবল একটি শিল্প হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি স্থায়ী ও মজবুত স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। বিশ্ব অর্থনীতির এই দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ে পর্যটন খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোই হবে বাংলাদেশের জন্য স্মার্ট অর্থনীতির পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রধান ধাপ।
