দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও উত্তর-স্বৈরাচারী সময়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে একতাবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, শহীদদের রক্তের মর্যাদা রক্ষা এবং একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে কেবল বিএনপি নয়, বরং গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সকল রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষকে এখন অভিন্ন লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
রবিবার (২১ ডিসেম্বর) বিকেলে বগুড়া শহরের শহীদ টিটু মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বীর শহীদদের স্মরণে বগুড়া জেলা বিএনপি কর্তৃক স্থাপিত ‘ডিজিটাল স্মৃতিস্তম্ভ’ এবং জনকল্যাণমূলক আইটি প্রকল্পের শুভ উদ্বোধন উপলক্ষে এই সভার আয়োজন করা হয়।
জুলাই আন্দোলনের অন্যতম অকুতোভয় সেনানী এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তারেক রহমান বলেন, “শহীদ ওসমান হাদি ছিলেন আদ্যোপান্ত একজন গণতান্ত্রিক মানুষ। তিনি ব্যালট ও ভোটের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন বলেই আগামী নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
তাঁর এই রাজনৈতিক অবস্থান প্রমাণ করে যে, তিনি জনগণের ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী ছিলেন।” তারেক রহমান আরও যোগ করেন যে, ১৯সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব—সকল শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন করতে হলে আমাদের মূল লক্ষ্য হতে হবে দেশে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং সমৃদ্ধির পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তরুণ প্রজন্মের নিবিড় সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ইন্টারনেট বর্তমানে শিক্ষা ও গবেষণার অপরিহার্য অংশ হলেও এর উচ্চমূল্য অনেকের জন্যই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুলাই শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজসহ জেলার ২০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যে ‘ফ্রি ওয়াই-ফাই’ সেবা চালু করা হয়েছে, তার প্রশংসা করে তিনি বলেন, “ইনশাআল্লাহ, আগামী নির্বাচনে জনগণের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করলে আমরা সারা দেশে ইন্টারনেট সেবাকে আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করব। আমাদের তরুণরা যেন কোনো আর্থিক বাধা ছাড়াই বিশ্বজ্ঞানের সাথে যুক্ত হতে পারে, সেটিই হবে আমাদের অগ্রাধিকার।”
দেশের বেকারত্ব দূরীকরণ ও স্বাস্থ্যসেবা আধুনিকায়নে তারেক রহমান এক বিশাল কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে দেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। নারী ক্ষমতায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, “এই এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে অন্তত ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ নিয়োগ দেওয়া হবে নারীদের। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন গ্রাম পর্যায়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে যাবে, অন্যদিকে লক্ষাধিক পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত হবে।”
বিগত সরকারের আমলে নির্মিত আইটি পার্কগুলোর অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে তৈরি করা ডিজিটাল পার্কগুলো বর্তমানে প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে আছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, বিএনপি সরকার এসব পার্ককে ‘রিফাবলিশ’ বা আধুনিকায়ন করে ফ্রিল্যান্সার, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং গ্রাফিক ডিজাইনারদের জন্য উন্মুক্ত কর্মক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলবে। এছাড়া বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির লক্ষ্যে ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে যাতে প্রবাসীরা মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান পেতে পারেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তারেক রহমান দলের ঘোষিত ‘৩১ দফা’ সংস্কার প্রস্তাবনার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং দেশ গড়ার নতুন স্লোগান ঘোষণা করেন। তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, “আমাদের সামনে এখন একটাই মিশন—করবো কাজ গর্ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। ব্যক্তি বা দলের স্বার্থের ঊর্ধ্বে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণকে স্থান দিতে হবে। তবেই আমাদের শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে।”
বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি জিয়াউল করিম বাদশার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের ডিজিটাল স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন এবং ফ্রি ইন্টারনেট সেবার এই বৈপ্লবিক সূচনামহল বিশেষ মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।

