গত ২১ নভেম্বরের সকালে বাংলাদেশে অনুভূত হওয়া ৫.৭ মাত্রার একটি মাঝারি ভূমিকম্প দেশের ভূমিকম্প ঝুঁকির ভয়াবহতা এবং আমাদের প্রস্তুতির দুর্বলতা আরেকবার সামনে এনেছে। এই সামান্য কম্পনই ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, টঙ্গী, ও নরসিংদীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে তাৎক্ষণিক আতঙ্ক ও দৌড়ঝাঁপের সৃষ্টি করে। এই ক্ষুদ্র কম্পন ছিল প্রকৃতির একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা—যা মনে করিয়ে দেয় যে আমরা এখনো সময়ের কাছে পিছিয়ে আছি এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া পরবর্তী বড় কম্পনে সহজে রক্ষা পাওয়া যাবে না।
২১ নভেম্বরের ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি বড় না হলেও এটি ছিল একটি সরাসরি সতর্কবার্তা। ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এটি দ্রুত আতঙ্ক ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই সময়ে সরকারি বা স্থানীয় উদ্ধার ও প্রক্রিয়া ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের দুর্বলতা দৃশ্যমান হয়। অনেক ভবনের বাসিন্দারা তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি ব্যবহার করছিলেন, জরুরি মুহূর্তে লিফট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রাথমিক চাপ তৈরি হয়েছিল। এটি ছিল আমাদের অবকাঠামো, জরুরি যোগাযোগ এবং জনসচেতনতা কতটা কার্যকর, তার একটি ‘লাইভ স্ট্রেস টেস্ট’। যদি এর চেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প আসত, তবে এই পরীক্ষার ফলাফল নিঃসন্দেহে আরও ভয়াবহ হতে পারত।
ভূমিকম্প ঝুঁকির ক্ষেত্রে পুরান ঢাকার অবস্থা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এই এলাকায় অনেক বাড়ি পুরোনো ইট ও সুরকি দিয়ে তৈরি এবং অনেক ভবনে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিতর্কিত বর্ধিত ফ্লোর রয়েছে। গবেষণা অনুসারে, ঢাকা শহরে ‘আন-রিনফোর্সড ব্রিক মেসনরি’ (Unreinforced Brick Masonry – URM) ধরনের ভবনগুলোর ভূমিকম্প-সহনশীলতা অত্যন্ত কম।
ভূমিকম্প হলে এই ধরনের ভবনগুলো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কারণ তাদের কাঠামোগত নকশা ও লোড-বাধ্যতামূলক ডিজাইনে দুর্বলতা রয়েছে। এছাড়াও, পুরান ঢাকার সংকীর্ণ ও কম প্রশস্ত রাস্তাগুলো উদ্ধার কাজকে অতিরিক্ত জটিল করে তুলবে, বিশেষ করে যদি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়।
বাংলাদেশের জন্য ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা নির্দেশকারী বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) থাকলেও, বাস্তবতা হলো অনেক ভবন এই কোড মেনে নির্মিত হচ্ছে না বা কোড প্রয়োগে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। আইপিডি (ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) সতর্ক করে যে, ভবন মালিক, ডেভেলপার এবং স্থানীয় প্রশাসন কোড উপেক্ষা করে ভবন তৈরি করছে, বিশেষত উচ্চ-চাপযুক্ত ও সংকীর্ণ রাস্তায়।
আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, আবাসিক এলাকার গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইনের নিরাপদ নকশা ও অবকাঠামো নেই। ভূমিকম্পের ফলে ধ্বংসের মুহূর্তে রান্নাঘরের গ্যাস লাইন ফেটে বড় আকারের অগ্নিকাণ্ড ঘটার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে। যদিও সরকার বিল্ডিং কোড হালনাগাদ করার চিন্তা করছে, তবে এর কঠোর প্রয়োগ এখনো থমকে আছে।
বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে বেশকিছু সক্রিয় ফল্ট চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ডাউকি ফল্ট, মধুপুর ফল্ট এবং প্লেট-বাউন্ডারি ফল্ট অন্যতম। ডাউকি ফল্ট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি প্রায় ৩০০ কিমি লম্বা এবং বিপুল শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম।
ভূতত্ত্ববিদরা উল্লেখ করেছেন যে, বেঙ্গল বেসিনে ভূ-টেকটোনিক গঠন এবং মাটির গঠন এমন, যা ভূকম্পনকে তীব্রভাবে বর্ধিত করতে পারে। বিশেষত ঢাকার মাটি নরম ও ভেজা (ডেল্টাইক পলিমাটি), যা ভূমিকম্পের কম্পনকে বাড়িয়ে দিতে পারে এবং মাটির তরলীকরণ বা লিকুইফ্যাকশনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ন, ভুল মাটি ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং বিল্ডিং কোডের উপেক্ষার সম্মিলিত প্রভাবে একটি বড় কম্পনের প্রভাব মারাত্মক হতে পারে। পরিবেশ বিজ্ঞানী অর্ঘ্য প্রতীক চৌধুরীর মতামত অনুসারে, ডাউকি ফল্টে প্রতি বছর প্রায় ১.৬ সেমি হারে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। যদি এই সঞ্চিত শক্তি আরও বাড়তে থাকে, তবে তা যেকোনো সময় বড় মাত্রার ভূমিকম্পে রূপ নিতে পারে। এই সঞ্চিত শক্তি বা ‘গ্যাপ থিওরি’ এক মারাত্মক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জনসচেতনতা: বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে ভূমিকম্প সম্পর্কে মৌলিক সচেতনতা নেই। ‘ডাক-কভার-হোল্ড’ (Duck-Cover-Hold) এর মতো জরুরি অ্যাকশন পয়েন্টগুলো যারা জানে, তাদের সংখ্যাও খুবই কম। সরকার ও বেসরকারি মিডিয়া এখনো ভূমিকম্প ঝুঁকি ও প্রস্তুতি বিষয়ে নিয়মিত জনসচেতনতা প্রচার করে না।
প্রশাসনিক সক্ষমতা: বহু ভবন এখনো বিএনবিসি অনুসরণ না করেই নির্মিত হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রশিক্ষণ এবং উদ্ধার সক্ষমতা বাড়াতে কাজ চললেও, দক্ষ জনশক্তি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়। বিশেষজ্ঞরা শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করে বিল্ডিং কোড এনফোর্সমেন্ট ও ঝুঁকিপ্রবণ ভবনগুলোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্যখাত: বড় ভূমিকম্পে হাসপাতাল ও জরুরি সেবা কেন্দ্রগুলোর ওপর অসহনীয় চাপ পড়বে। বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসা সেবা, অ্যাম্বুলেন্স সেবা ও উদ্ধার টিমের সংকট রয়েছে। ভবন ধ্বংসের ক্ষেত্রে চিকিৎসার জন্য সুরক্ষা এবং স্থানান্তর ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনায় ঘাটতি রয়েছে।
নগর পরিকল্পনা: ঢাকায় জরুরি আশ্রয় কেন্দ্রের জন্য খোলা মাঠ বা উন্মুক্ত জায়গা অত্যন্ত সীমিত। বিশেষজ্ঞরা প্রস্তাব দিচ্ছেন, নগরায়ন নীতিতে ভূমিকম্প সহনশীল নকশা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি জরুরি আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করার জন্য আরও পার্ক ও উপযোগী উন্মুক্ত জায়গা রাখা উচিত।
ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে এবং এর প্রভাব নগরায়ন, অবকাঠামো ঘাটতি, জনসংখ্যা ঘনত্ব এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে বহুগুণে বেড়ে যাবে। তাই এখনই সময় কালক্ষেপণ না করে যথাযথ প্রস্তুতি গড়ে তোলার মাধ্যমে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা করা।

