১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি সামরিক সংঘাত ছিল না; এটি ছিল এক বিশাল জনযুদ্ধ—একটি জাতির অস্তিত্ব, মর্যাদা এবং অধিকার আদায়ের সম্মিলিত সংগ্রাম। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক শোষণ, সাংস্কৃতিক নিপীড়ন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে দেশের আপামর সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলেই এই স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়েছিল। এই যুদ্ধে বাংলার প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষ—ছাত্র, শিক্ষক, পেশাজীবী, কৃষক, শ্রমিক, নারী, যুবক—সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে, নিজেদের জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই তৎকালীন পূর্ব বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছিল। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে নিজেদের মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবি, এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মতো প্রতিটি আন্দোলন জনগণের মধ্যে স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা সুদৃঢ় করে তোলে। এই ধারাবাহিক আন্দোলনই প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছিল এবং স্বাধীনতা ছিল তাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নজিরবিহীন ও ভয়াবহ গণহত্যার মাধ্যমে যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ নেমে আসে, তখনই চূড়ান্ত সশস্ত্র প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নেয় গোটা জাতি। সেই মুহূর্তে, এটি আর কোনো রাজনৈতিক দলের বা গোষ্ঠীর আন্দোলন থাকেনি; এটি পরিণত হয় সমগ্র জাতির জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে।
মহান মুক্তিযুদ্ধ ট্যাংক, কামান বা আধুনিক অস্ত্রের একক যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল সর্বাংশে এক মানবিক ও সর্বজনীন জনযুদ্ধ। এই যুদ্ধের মালিকানা কোনো একক শ্রেণি, দল বা মতাদর্শের হাতে ছিল না, বরং এর মালিক ছিল বাংলার প্রতিটি মানুষ। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সমাজের তথাকথিত অবহেলিত ও প্রান্তিক মানুষেরাই হয়ে ওঠে এই যুদ্ধের প্রধান চালিকাশক্তি।
জেলে, তাঁতি, কামার, কুমার, ধোপা, নাপিত, মেথর, মুচি—সমাজের এই প্রান্তিক মানুষেরাই সাহস ও দৃঢ়তা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেউ সরাসরি রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে লড়াই করেছে, কেউবা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাদ্য, আশ্রয় ও তথ্য সরবরাহ করেছে, আবার কেউবা সাহস জুগিয়ে প্রেরণা দিয়েছে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। ২৫ মার্চের কালরাতের গণহত্যায় বাংলার মানুষ আর সহনশীলতার পথে না থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা একটি পূর্ণাঙ্গ জনযুদ্ধের ভিত্তি স্থাপন করে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সবার অংশগ্রহণে দেশ স্বাধীন হলেও, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে দীর্ঘকাল ধরে জনযুদ্ধ বা সাধারণ জনগণের এই বিশাল সম্পৃক্ততার বিষয়টি অনেকাংশে উপেক্ষিত ছিল। বর্তমানে কিছু গবেষক ব্যক্তিগত উদ্যোগে সাধারণ জনগণের এই গৌরবময় অংশগ্রহণের ঘটনাগুলো তুলে আনছেন, যা দেশের ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত জরুরি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, কোনো প্রথাগত প্রশিক্ষণ বা নির্দেশের অপেক্ষা না করে প্রান্তিক মানুষেরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যুদ্ধে নেমেছিল। বিবেকবোধই তাদের ঘরে থাকতে দেয়নি। মেহনতি মানুষ, কৃষক-কৃষাণী লাঙল ফেলে অস্ত্র ধরেছিল, শ্রমিকেরা কারখানার গেট বন্ধ করে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
এই জনযুদ্ধের প্রকৃত চিত্র অসংখ্য মানবিক কাহিনিতে প্রতিফলিত হয়। সেইসব কাহিনিতে লুকিয়ে আছে রক্ত ঝরা সংগ্রামের কথা, টিকে থাকার কৌশল, ঘরে ছেড়ে যুদ্ধে যাওয়া তরুণের বিয়োগান্তক বর্ণনা, সন্তানকে যুদ্ধে পাঠানো মায়ের বুকভাঙা গল্প এবং অসংখ্য নারীর সম্ভ্রম হারানোর করুণ আখ্যান।
মুক্তিযোদ্ধাদের একবেলা ভাত খাওয়ানো, বিনা ভাড়ায় নদী পার করে দেওয়া, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তথ্য ও আশ্রয় দেওয়া এবং এই কারণে সর্বস্ব হারানোর অসংখ্য ঘটনা এই জনযুদ্ধের মানবিকতার দলিল। সেইসব মানুষের হাতে হয়তো কোনো সনদ নেই, রাষ্ট্রীয় খেতাবের তালিকাতেও তাদের নাম নেই। কিন্তু সত্য হলো, তারাই এই জনযুদ্ধের প্রকৃত সৈনিক এবং জনগণের হৃদয়ে তারা চির অমর।
১৯৭১ সালের এই সংগ্রাম ছিল সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা সবখানেই ছিল স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। ধর্ম তখন বিভেদের কারণ না হয়ে বরং মানবিক ঐক্য ও শক্তির প্রতীক ছিল। সবার একটাই পরিচয় ছিল—বাঙালি। কবি গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের ভাষায়, “বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রীষ্টান, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালী।”
এই যুদ্ধ কোনো ডান-বাম রাজনীতির যুদ্ধ ছিল না; এটি কোনো গোষ্ঠীর ক্ষমতা দখলের লড়াইও ছিল না। এটি ছিল এদেশের প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার এবং আজন্ম আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। স্বাধীনতা ছিল একটি ন্যায্য, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সম্মিলিত স্বপ্ন।
আজ স্বাধীনতার এত বছর পর দাঁড়িয়ে যখন সমাজে বিভেদ, হিংসা, আত্মকলহ ও ধর্মীয় বিদ্বেষ বাড়ছে, তখন আমরা যেন অসহায় বোধ করি। মতের অমিল বা বিশ্বাসের পার্থক্যে মানুষ যখন মানুষকে শত্রু ভাবছে, তখন ১৯৭১-এর সেই মহৎ শিক্ষা—যেখানে সহনশীলতা ও মানবিকতা ছিল মূল ভিত্তি—তা যেন সংকুচিত হচ্ছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা কেবল একটি পতাকা নয়; স্বাধীনতা হলো মূল্যবোধ, সহমর্মিতা ও মানবিকতার চর্চা। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’—এই বাণীই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল দর্শন। মানুষকে বাদ দিয়ে কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না, কোনো স্বাধীনতা অর্থবহ হয় না।
আজ সময় এসেছে আবার সেই জনযুদ্ধের চেতনায় ফিরে যাওয়ার। অস্ত্র হাতে নয়, বরং বিবেক, সহনশীলতা ও মানবিকতাকে পাথেয় করে। আসুন, আমরা সবাই মিলে সাম্যের একটি দেশ গড়ি, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে কিন্তু ঘৃণা থাকবে না, যেখানে ধর্ম বিশ্বাস থাকবে কিন্তু বিদ্বেষ থাকবে না। বাংলার স্বাধীনতা এসেছিল মানুষের হাত ধরে। সেই স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতেও লাগবে মানুষকেই—মানবিক, সচেতন ও সহনশীল মানুষকে। এটাই হবে ১৯৭১ সালের জনযুদ্ধের প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা।
