বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহর আজ যে বিপুল ভারাক্রান্ত মহানগরীতে পরিণত হয়েছে, তার মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের ভারসাম্যহীন উন্নয়ন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নীতিগত দুর্বলতা। স্কটিশ নগর পরিকল্পনাবিদ প্যাট্রিক গেডেস কর্তৃক ১৯১৭ সালে প্রথম মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়নের সূচনা হলেও, স্বাধীনতার পর প্রায় ২৫ বছর সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। বর্তমানে রাজউকের ‘বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ ২০২২–২০৩৫)’ কার্যকর থাকলেও, নগরীর টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে গেলে মৌলিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে অপার সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানো জরুরি।
ঢাকার টেকসই পরিকল্পনার প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলি বহুমুখী এবং গভীরভাবে প্রোথিত: অত্যধিক কেন্দ্রীকরণ: শাসন ও অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য ঢাকাকে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। সমগ্র দেশের মাত্র ১% ভূমি নিয়ে গঠিত এই মহানগরী দেশের নগর জনসংখ্যার প্রায় ১১% ধারণ করে এবং মোট জিডিপিতে ৩৩% এরও বেশি অবদান রাখে। এই ভারসাম্যহীন কেন্দ্রীকরণ ঢাকার ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করেছে।
পরিকল্পনাহীন বৃদ্ধি ও ধারাবাহিকতার অভাব: স্বাধীনতার পর সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নে ২৫ বছরের বিলম্বের ফলে ততদিনে শহরের আয়তন ২৫ গুণ এবং জনসংখ্যা প্রায় ৩০ গুণ বৃদ্ধি পায়। পরিকল্পিত উন্নয়নে এই ধারাবাহিকতার অভাবের কারণে নগরের অভিঘাত—যেমন বন্যা, জলাবদ্ধতা, যানজট, দূষণ (জল, জন, জমি, বায়ু, শব্দ, বর্জ্য, তাপ) ও দুর্যোগ ঝুঁকি—অসহনীয়ভাবে বেড়েছে।
অননুমোদিত নির্মাণ: ড্যাপ (২০২২–২০৩৫) অনুযায়ী ঢাকার প্রায় ৯৪% ভবনই অননুমোদিত এবং ৬৮% একতলা। বিপুল সংখ্যক কাঁচা বা সেমি-পাকা ভবনের উপস্থিতিতে মাত্র ৮-১০% ভবনের তুলনামূলক স্থায়ী বা সর্বোচ্চ উন্নয়ন হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাধার ও কৃষিজমি ধ্বংস এবং অনুমোদনহীন ভবনই বর্তমান সংকটের অন্যতম মূল কারণ।
বিকলাঙ্গ নগরায়ণ: ভারসাম্যহীন উন্নয়ন এবং ব্যাপক নগর দূষণের কারণে বর্তমানে এই নগরায়ণ একটি ‘বিকলাঙ্গ প্রজন্ম’ তৈরি করছে, যা গভীর সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।
চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও ঢাকা শহরের পুনর্গঠন ও টেকসই উন্নয়নের অপার সুযোগ রয়েছে। যেহেতু মাত্র ৮-১০% ভবনের স্থায়ী কাঠামো তৈরি হয়েছে, তাই বিপুল সংখ্যক অননুমোদিত, কাঁচা বা সেমি-পাকা ভবনের পুনর্গঠন বা নিয়মবদ্ধ করার মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা গড়ে তোলার বড় সুযোগ এখনো অবশিষ্ট। অব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘদিনের ভুল নীতির কারণে সৃষ্ট এই পরিস্থিতিকে সঠিক নগর-দর্শন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক নগরীতে রূপান্তর করা সম্ভব।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিম্নোক্ত পাঁচটি জরুরি ও অগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য: রাজউক কর্তৃক প্রণীত ‘ঢাকা মহানগর এলাকায় অনুমোদনহীন/ইমারতের বিচ্যুতি/ব্যত্যয় সংক্রান্ত ইমারতের ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে নীতিমালা (খসড়া)’ দ্রুত গেজেট আকারে প্রকাশ ও বাস্তবায়ন করা আশু প্রয়োজন। এই নীতিমালার উদ্দেশ্য শাস্তি আরোপ নয়, বরং ‘পুনঃউন্নয়ন ফান্ডের’ মাধ্যমে অবৈধ বা বিচ্যুত ভবনগুলিকে সংশোধিত ও প্রয়োজনীয় পরিমার্জন সাপেক্ষে যথাযথ এবং নিরাপদ করার সুযোগ তৈরি করা। এটি নিরাপদ নগর ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অনুমোদিত কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে অভিঘাত সহনশীল নগরী গড়ার প্রথম ধাপ।
২০০৬ সালে গেজেট হওয়া এবং পরবর্তীতে হালনাগাদ বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC 2020) কখনোই যথাযথভাবে প্রয়োগ করা যায়নি। বিএনবিসি নির্দেশিত বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি (BBRA) এখনো গঠিত হয়নি, অথচ সারা দেশে নিরাপদ ভবন নির্মাণ নিশ্চিতে এটি জরুরি। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে দ্রুততম সময়ে বিবিআরএ গঠন সংক্রান্ত খসড়া অধ্যাদেশ চূড়ান্তকরণপূর্বক কর্তৃপক্ষ গঠন করে দেশব্যাপী সক্ষমতা ও সামর্থ্য তৈরি করা।
পাশাপাশি, প্রতিটি ভবনকে অডিটপূর্বক প্রতি বছর নবায়নযোগ্য সার্টিফিকেশনের আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে রাজউক, ফায়ার ব্রিগেড ও সিটি কর্পোরেশনের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা অত্যাবশ্যক। উপযুক্ত জবাবদিহির চাপ তৈরি হলে ভবন খাতেও গার্মেন্টস শিল্পের মতো দ্রুত পরিবর্তন আনা সম্ভব।
২০১৫ সালে রাজউকের ‘আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্প (ইউআরপি)’ গ্রহণ করা হয়েছিল অবকাঠামোর ঝুঁকি মূল্যায়ন, বিল্ডিং কোড শক্তিশালীকরণ, জরুরি সাড়া সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দুর্যোগ-সহনশীল নগরব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে সমীক্ষা ও প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গঠন না হওয়ায় প্রকল্পের বাস্তব প্রয়োগ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক ভূমিকম্পসহ অন্যান্য দুর্যোগ-ঝুঁকি মোকাবিলায় এই ইউআরপি প্রকল্পের পাশাপাশি ‘আপদকালীন পরিকল্পনা (কন্টিনজেন্সি প্ল্যান)’-এর সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন নিশ্চিতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একইসাথে দুর্যোগ পরবর্তী আপদকালীন স্থান হিসেবে নগর জুড়ে রিফিউজ স্পেস, উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, ব্লু-নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা এবং কমপক্ষে ২০ ফুট প্রশস্ততার সড়ক নির্মাণ করা আবশ্যক।
নগর সুব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে দুটি বিশেষ টুল বা ধারণা কার্যকর করতে হবে, যা ড্যাপ ২০২২-২০৩৫-এও উল্লিখিত হয়েছে: উন্নয়ন স্বত্ব বিনিময় (Transfer of Development Rights – TDR): এই পদ্ধতিতে, যেখানে উন্নয়ন সীমিত—যেমন কৃষিজমি, জলাধার বা ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা—সেসব এলাকার মালিকরা তাদের অব্যবহৃত ফ্লোর এরিয়া রেশিও (FAR) অন্য এলাকায় বিক্রি বা স্থানান্তরিত করতে পারেন। এর মাধ্যমে সংবেদনশীল এলাকা সংরক্ষিত থাকে, জমির মালিক আর্থিক ক্ষতি এড়ায়, এবং প্রয়োজনীয় স্থানে উন্নয়ন উৎসাহিত হয়।
ব্লক ভিত্তিক উন্নয়ন (Block Development): এটি বিচ্ছিন্ন ছোট প্লট একত্র করে বড় ব্লক তৈরি করে তার নির্দিষ্ট অংশ উন্মুক্ত স্থান হিসেবে সংরক্ষণ এবং বাকি অংশে পরিকল্পিত বহুতল ভবন নির্মাণের একটি পদ্ধতি। উপযুক্ত প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে ‘ব্লকভিত্তিক উন্নয়ন’ সমন্বিত, বাসযোগ্য ও সুসংগঠিত নগর কাঠামো এবং পর্যাপ্ত খোলা স্থান নিশ্চিত করতে পারে।
ঢাকা শহরের পুনঃউন্নয়নকল্পে এই দুটি ধারণার ওপর ভিত্তি করে উপযুক্ত নীতিমালা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন আশু কাম্য। দুর্যোগ মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সিভিল ডিফেন্স অংশকে শক্তিশালী করতে হবে। সচেতনতা (Awareness) এবং প্রস্তুতি (Preparedness) এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে পাড়া-মহল্লা-অঞ্চলভিত্তিক প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী নাগরিক দল গঠনের মাধ্যমে শক্তিশালী করতে হবে। নিয়মিত দুর্যোগ মোকাবিলা মহড়া পরিচালনা এবং জনসাধারণের মধ্যে জনসচেতনতা বৃদ্ধি অতীব জরুরি। প্রয়োজনে ফায়ার কোড প্রণয়ন, ফায়ার একাডেমী বা ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন এবং দেশব্যাপী স্যাটেলাইট ফায়ার স্টেশন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি কমিউনিটি স্তরে দৃঢ়ভাবে প্রথিত করাই আবশ্যক।
এই প্রস্তাবিত পদক্ষেপসমূহ বাস্তবায়নের জন্য সর্বাধিক অগ্রাধিকার প্রদানের এখনই উপযুক্ত সময়, যাতে নতুন নির্বাচিত সরকার এই কার্যক্রমকে আরও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সদিচ্ছার সাথে এগিয়ে নিতে পারে।
