ইতিহাসের সঙ্গে কার এই সংলাপ? ইতিহাস কি সত্যিই কথা বলে? সম্ভবত হ্যাঁ। ইতিহাসের ভরকেন্দ্রটি ছড়ানো থাকে অতীত ও বর্তমান—এই দুই সময়ের মেরুতে। ইতিহাস এই দুই মেরুকে যুক্ত করে এবং এই প্রক্রিয়ার মাঝেই তৈরি হয় ঐতিহাসিকের সঙ্গে, এবং বৃহত্তর অর্থে, মানুষের সঙ্গে তার সংলাপ।
ইতিহাস কেবল রণক্ষেত্রের বিবরণ, সভ্যতার উত্থান-পতনের কাহিনি কিংবা কিছু তারিখের সমষ্টি মাত্র নয়। একজন ইতিহাসবিদ যখন ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন, তিনি বর্তমানের অংশ হয়েও অতীতের উপাদান নিয়ে কাজ করেন। সেই উপাদান তাঁর চিন্তার ভেতর দিয়ে পুনঃরূপায়িত হয়, যা কখনো মানুষের উজ্জ্বল উত্থানের গল্প, আবার কখনো পতনের অন্ধকার বর্ণনা করে।
এই পুনঃরূপায়িত বা বিশ্লেষিত ইতিহাস যখন বইয়ের পাতায় আমাদের সামনে উপস্থাপিত হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—জনভাবনার কাছে তার দায় কতটুকু? যে জনগণ ইতিহাস তৈরি করে, তাদের ইতিহাস চেতনা কি সর্বদা চিন্তার গভীরে প্রোথিত? জনগণ প্রায়শই জীবন প্রবাহের শিকার। তাই প্রশ্ন জাগে, ইতিহাসের দায় মেটানোর সামর্থ্য কি তাদের আছে?
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, ১৯৭১ সালে। এই সংগ্রাম বহু মানুষের প্রাণের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে একটি নতুন ভৌগোলিক কাঠামোর জন্ম দিয়েছে। এই জন্ম প্রক্রিয়ার রয়েছে এক সুনির্দিষ্ট ইতিহাস—রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এক নতুন জাতিগোষ্ঠীর উন্মোচন ঘটায়।
হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডে বসবাসকারী একটি জাতির দীর্ঘ বঞ্চনা ও শোষণের অপচ্ছায়া থেকে মুক্তির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি স্বাধীন দেশের অভ্যুদয় ঘটে।
বিশ্লেষিত বা পুনঃরূপায়িত ইতিহাস হলো প্রকৃতপক্ষে সচল, সজীব অতীতের এক স্থির প্রতিচ্ছবি। সেখানে থাকে মানুষ, মানুষের সংগ্রাম, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক চেতনা নির্মাণের ধারাবাহিক কাহিনি। এই সবকিছু মিলেই একটি জাতির ইতিহাস নির্মিত হয়। এই ইতিহাসের চেতনাকে সংরক্ষণ করা ভূখণ্ডের মানুষের মৌলিক দায়।
কিন্তু আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্র প্রায়শই ইতিহাস চেতনার বিস্মৃতি ঘটাতে চায়। এই আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্রের কোনো নির্দিষ্ট অধিকারী, আধার বা কেন্দ্র নেই। রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত কোনো গোষ্ঠী বা পুঁজির মালিকশ্রেণী পরিবর্তন হলেও এই ক্ষমতাতন্ত্র একই ছকে চলতে থাকে। ক্ষমতার মুঠি থেকে আধুনিক সমাজবদ্ধ মানুষের মুক্তি নেই। তবে কি প্রতিরোধ সম্ভব নয়? ব্যক্তিগতভাবে অথবা গোষ্ঠীবদ্ধভাবে এই প্রতিরোধ গড়ে তোলাই কি তবে ইতিহাস বা ইতিহাস চেতনা রক্ষার জন্য মানুষের নতুন লড়াই?
আমাদের বাংলাদেশেও আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্র বিভিন্ন সময়ে তাদের পছন্দসই ছকে ফেলে ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছে। রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির প্রয়োজনে ইতিহাসের খণ্ডাংশকে মূল ইতিহাস বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ইতিহাসও সে সাক্ষ্যই দেয়। মজার বিষয় হলো, ক্ষমতাতন্ত্রের কোনো পক্ষই বোঝে না যে স্লেট একটাই। বারংবার আগের সব লেখা মুছে দিয়ে নতুন কিছু লেখার এই চেষ্টা, ইতিহাসের শরীরে অজস্র কাটাকুটি, মুছে দেওয়া অথবা অস্বীকার করার দাগ ফেলে চলেছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তাদের স্বাধীনতা, উপনিবেশবাদের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি এবং একটি স্বাধীন পতাকা লাভের জন্য সশস্ত্র লড়াইয়ের ইতিহাস ও কিছু মৌলিক চেতনাকে সযত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছে।
অথচ আমাদের জাতীয় যুদ্ধের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং দেশ নিয়ে মানুষের মনে থাকা মৌলিক ভাবনাগুলো ঘিরে নতুন করে তর্ক উঠছে। আর এর ফলেই আমাদের অগ্রযাত্রার ইতিহাস কখনো মুখ থুবড়ে পড়ছে, কখনো পিছিয়ে যাচ্ছে, আবার কখনো অসহায়ের মতো মাঝপথে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে।
এখানে সেই নিরাবয়ব অথচ শক্তিশালী ক্ষমতাতন্ত্র সক্রিয়। তারা নতুন পুঁজিকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে, নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যাখ্যার নিশান ওড়াতে জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে চাইছে।
ইতিহাস একটি জাতির আত্মপরিচয়, তাদের অর্জন। কখন একটি দেশের মানুষ ক্ষমতাতন্ত্রের প্রচারণার জালে আটকা পড়ে ইতিহাস ভুলতে শুরু করে? উত্তরটি সহজ: ক্ষমতা আর রাজনীতির চক্র যখন নতুন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটাতে আগ্রহী হয়, তখনই তারা আক্রমণ করে ইতিহাসকে। কারণ জন্ম পরিচয়ের ইতিহাসে সংকট তৈরি করে দিতে পারলে সহজে জল ঘোলা করে নিজেদের স্বার্থ বাস্তবায়ন করে ফেলা যায়। তাদের প্রচারণা এবং জটিল রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ধুম্রজালে সাধারণ জনগণের মনে বিভ্রান্তির পর্দা নামতে শুরু করে, যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে একটি জাতির যাত্রাকে থামিয়ে দেওয়া বা ভিন্ন পথে ঘুরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র।
ইতিহাসের সহযাত্রী চরিত্র মানুষ। ইতিহাসই মানুষকে সময়ের অসঙ্গত প্রভাব এবং আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক আবহাওয়ার অত্যাচার থেকে রক্ষা করে। ইতিহাস তার সহযাত্রীকে গোটা যাত্রাপথটি বুঝতে সাহায্য করে। কারণ মানুষকে মুক্তি দেয় মানুষেরই ইতিহাস। এই কথাটি অনুধাবনের জায়গাটি কঠিন হলেও, জনভাবনার কাছে ইতিহাসের দায় আছে। কারণ সাধারণ মানুষের অনুধাবন ও ইতিহাস চেতনা ইতিহাসকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য মূল্যবান।
ইতিহাসবিদ ও রাজনীতির গবেষকরা মনে করেন, ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ খুব একটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে না পারলেও, এই প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনকে উপেক্ষা করা যায় না।
বাংলাদেশ তার নিজস্ব শৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলা নিয়ে ১৯৭১ সালে যে পথে যাত্রা শুরু করেছিল, সেই যাত্রাপথ নানা সময়ে বাধার মুখে পড়েছে। এই প্রতিবন্ধকতা তৈরির প্রচেষ্টা আজও সক্রিয়, যার ফলে সাধারণ মানুষের মনে সহজেই বিভ্রান্তির ঘোর তৈরি হচ্ছে।
স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ায় নতুন প্রজন্মের অবস্থান ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে দূরে। ফলে প্রচারণার ভিন্ন ব্যাখ্যা তাদের সামনে দাঁড়াচ্ছে। নতুন ক্ষমতাতন্ত্র স্বাধীনতার ইতিহাসের নতুন ব্যাখ্যা হাজির করতে সচেষ্ট। তাদের ভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু এটি সত্য যে, একটি জাতির স্বীকৃত ইতিহাসের বিপরীতে ভিন্ন আরেকটি ব্যাখ্যা দাঁড়ানোর চেষ্টা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের অবস্থানকে দুর্বল করে তোলে, রাষ্ট্রের কাঠামোকেও বিপদাপন্ন করে।
ইতিহাস অতীতের স্থির, কিন্তু সত্য চিত্র। ইতিহাস অব্যাহতভাবে অতীত ও বর্তমানের মাঝে নিজস্ব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেতুবন্ধ তৈরি করে চলে। কেউ হয়তো বলতে পারেন, ইতিহাস কথা বলতে সক্ষম নয়, তার সঞ্চয় কেবল কিছু পৃষ্ঠা, ঘটনা আর তারিখের সমন্বয়। কিন্তু ইতিহাসের অসংখ্য তথ্য, নানা ছবি কি আমাদের ঘটে যাওয়া সত্যের বিবরণ জানায় না? বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে মানুষ কি পৌঁছায় না প্রকৃত সত্যে?
ইতিহাস এভাবেই অতীত ও বর্তমানের ভেতর দিয়ে এক অন্তহীন সংলাপে জড়িত থাকে মানুষের সঙ্গে। অতীত কথা বলে বর্তমানের সঙ্গে। এই সংলাপ জরুরি ভবিষ্যতের জন্য।
