দুর্নীতি দমনে সরকারের উচ্চকণ্ঠ ঘোষণার বিপরীতে বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)। সর্বশেষ প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশে দুর্নীতির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় স্কোর কমেছে, যা বিগত তেরো বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। যদিও অন্য দেশগুলোর তুলনামূলকভাবে খারাপ পারফরম্যান্সের কারণে বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আপাতদৃষ্টিতে চার ধাপ এগিয়েছে।
টিআই কর্তৃক প্রকাশিত সিপিআই-২০২৪ সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ১০০ এর মধ্যে দাঁড়িয়েছে ২৩, যা ২০২৩ সালের স্কোরের (২৪) তুলনায় এক পয়েন্ট কম। স্কোর কমে যাওয়ার এই প্রবণতা দেশের দুর্নীতি পরিস্থিতির অবনতিকেই নির্দেশ করে। উচ্চক্রম অনুযায়ী (স্বচ্ছ থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত), বাংলাদেশের অবস্থান ১৫১তম (২০২৩ সালে ছিল ১৪৯তম)। তবে নিম্নক্রম অনুযায়ী (সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত থেকে কম দুর্নীতিগ্রস্ত), বাংলাদেশের অবস্থান ১৪তম (২০২৩ সালে ছিল ১০ম)।
টিআইবি (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই স্কোর হ্রাসকে উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, স্কোরে এক পয়েন্ট কমার অর্থ হলো দেশে দুর্নীতির মাত্রা আরও বেড়েছে। তবে অন্য দেশগুলোর স্কোর আরও বেশি কমে যাওয়ায় সূচকে নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশ চার ধাপ এগিয়ে ১৪তম অবস্থানে এসেছে, যা বাস্তবে দুর্নীতি কমা নয়, বরং কাঠামোগত দুর্বলতা ও শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতাকে তুলে ধরে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সরকারি সুযোগের অপব্যবহারের মাধ্যমে দলবাজি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মাধ্যমে বিভিন্ন মহল দুর্নীতিতে লিপ্ত রয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে দুর্নীতির ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। একসময় ঘুষের পরিমাণ কম থাকলেও, বর্তমানে তা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা সেবা প্রাপ্তির জন্য টেবিলে টেবিলে প্রদান করতে হয়। এমনকি কেজি দরে ঘুষ লেনদেন বা ডলারে ঘুষ আদান-প্রদানের মতো গুরুতর অভিযোগও গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, যা দুর্নীতির বিস্তৃতি ও গভীরতা স্পষ্ট করে।
একাধিক পরিষেবা খাতে, যেমন- ভূমি নিবন্ধন অফিস (সাব-রেজিস্ট্রি অফিস) বা নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোতে (যেমন রাজউক) দুর্নীতি একটি সিস্টেমের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, সকল প্রকার নিয়মনীতি মেনে চললেও ফাইল আটকে দেওয়া হয়, এবং কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে ঘুষ দিতে বাধ্য হন। এই অবস্থায় নাগরিকদের মধ্যে নিয়ম মেনে সেবা পাওয়ার বিশ্বাস ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
দুর্নীতির এই কাঠামোগত রূপের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হলো জমি কেনা-বেচার প্রক্রিয়া। দেশের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে অভিজাত অঞ্চলগুলোতে (যেমন গুলশান, বারিধারা), জমি বা সম্পত্তির প্রকৃত বাজারমূল্য দলিলে অনেক কম দেখানো হয়। এর ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই সরকারকে সঠিক রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করেন এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ অপ্রদর্শিত থেকে যায়। একদিকে, করের বোঝা থেকে বাঁচার জন্য মৌজা দরে রেজিস্ট্রেশন করা হয়; অন্যদিকে, রাষ্ট্রও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারায়। সরকারি পর্যায়ে এই সমস্যা সমাধানের জন্য পূর্বে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এর কার্যকর সমাধান এখনো মেলেনি। এই পরিস্থিতিতে কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের ত্রুটির কারণেই নাগরিকেরা অনিয়ম বা দুর্নীতির জালে জড়িয়ে পড়েন।
দুর্নীতি দমনে তদন্ত সংস্থার স্বাধীনতা ও সুরক্ষার অভাব একটি বড় বাধা। আইনগতভাবে স্বাধীন বলা হলেও, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ, বাজেট ও তদন্তের অগ্রাধিকার নির্ধারণে প্রায়শই নির্বাহী প্রভাব থাকে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
তাছাড়া, দুর্নীতির তথ্য প্রকাশকারী বা হুইসেল ব্লোয়ারদের জন্য পর্যাপ্ত আইনি ও নিরাপত্তা সুরক্ষার অভাব বিদ্যমান। তদন্তকারী কর্মকর্তা, ব্যাংক কর্মকর্তা বা সাংবাদিক, যারা অনিয়ম ফাঁস করেন, তারা প্রায়শই হয়রানি, মামলা বা হুমকির মুখে পড়েন, ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা নীরব থাকতে বাধ্য হন। এই নীরবতাই দুর্নীতিকে আরও পাকাপোক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা ভুটানের মতো দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায় যে, দুর্নীতির মাত্রা কমাতে শক্তিশালী ও স্বাধীন তদন্ত সংস্থা অত্যাবশ্যক। এই দেশগুলো কাঠামোগত পরিবর্তন এনে, নিয়ম সহজ করে এবং সমাজে দুর্নীতির প্রতি সহনশীলতা কমিয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে।
বাংলাদেশেও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সকল তদন্ত সংস্থার স্বাধীনতা বাস্তবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলের অর্থায়নে স্বচ্ছতা আনাও জরুরি, যাতে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব কমানো যায়। সবশেষে, রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে নাগরিক চাপ বা গণজোয়ার তৈরি হওয়া প্রয়োজন, যা দুর্নীতি দমনে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
