পর্যটন খাত পৃথিবীর অন্যতম দ্রুত বিকাশমান অর্থনৈতিক শক্তি হলেও, এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর অত্যাধিক নির্ভরশীল একটি শিল্প। পর্যটনের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা অনুসারে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা হলো এই খাতের সবচেয়ে বড় নির্ধারক (Primary Determinant) এবং এর টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত। পর্যটকরা ভ্রমণের গন্তব্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, শান্ত পরিবেশ, সুসংগঠিত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নীতিগত স্থায়িত্বকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেন।
পর্যটন চাহিদা inherently সংবেদনশীল (Highly Sensitive) এবং ঝুঁকি-এড়ানো প্রবণ (Risk-Averse)। যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা, বিক্ষোভ, সন্ত্রাসী হামলা, নির্বাচন-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বা রাষ্ট্রীয় সংঘাতের প্রভাব সরাসরি এবং তাৎক্ষণিকভাবে এই খাতে প্রতিফলিত হয়।
নিরাপত্তা উদ্বেগ: পর্যটন মূলত একটি বিলাস-নির্ভর (Voluntary/Discretionary) ব্যয়। সামান্যতম ঝুঁকির পূর্বাভাসও পর্যটককে তাদের গন্তব্য পরিবর্তনে বাধ্য করে। প্রখ্যাত গবেষক সেভিল এফ. সনমেজ (Sevil F. Sonmez) যুক্তি দেন যে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা পর্যটন চাহিদার প্রধান নির্ধারক। রাজনৈতিক ঝুঁকিযুক্ত আকর্ষণীয় গন্তব্যও পর্যটকরা এড়িয়ে চলেন।
আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সতর্কতা: রাজনৈতিক সংকট দেখা দিলেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বা ইউনাইটেড নেশনস ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন (UNWTO) এবং বিভিন্ন দেশের সরকার আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে। দূতাবাস বা সরকারের ভ্রমণ-নির্দেশনা (যেমন ‘Avoid Travel’ বা ‘Red Alert’) সরাসরি পর্যটকদের ভ্রমণ বাধাগ্রস্ত করে এবং পর্যটকের আগমন তাৎক্ষণিকভাবে হ্রাস পায়।
গণমাধ্যমের ভূমিকা: রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সহিংসতা সম্পর্কিত গণমাধ্যমের নেতিবাচক প্রচার একটি দেশের পর্যটন ব্র্যান্ড ইমেজকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
মিশর (২০১১): আরব বসন্ত আন্দোলনের সময় পর্যটক সংখ্যা দ্রুত কমে যায় এবং সেই ক্ষতি পুনরুদ্ধারে এক দশকের বেশি সময় লাগে।
শ্রীলঙ্কা (২০১৯): গৃহযুদ্ধ শেষে দ্রুত প্রবৃদ্ধি এলেও ‘ইস্টার অ্যাটাক’ (Easter Bombings) নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং হামলার পরপরই পর্যটকের আগমন ৭০ শতাংশ কমে যায়।
ফ্রান্স (২০১৫): প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার পর পর্যটকের সংখ্যা ১০ শতাংশ, এবং এশিয়ান পর্যটকের আগমন ২০ শতাংশ হ্রাস পায়।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কেবল নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না, এটি পর্যটন শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে।
পর্যটন শিল্পে অবকাঠামো নির্মাণ (যেমন—হোটেল, রিসোর্ট, মোটেল, থিম পার্ক) এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া সম্ভব নয়।
ঝুঁকি হ্রাস: রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশ বিনিয়োগবান্ধব হয়। অস্থিরতা বা নীতিগত পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। গবেষক হিচনার ও ব্রুম (Hichner and Broom) প্রমাণ করেছেন যে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আসে না, ফলে পর্যটন অবকাঠামো দুর্বল থাকে।
নীতিগত ধারাবাহিকতা: সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল সরকার এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা থাকায় তারা পর্যটনে এগিয়ে গেছে। অস্থিরতা সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বিলম্বিত বা স্থগিত করে এবং সরকারের তহবিল নিরাপত্তা খাতে সরিয়ে দেয়, যা পর্যটন উন্নয়নে বাধা দেয়।
পর্যটন একটি দেশের উন্নত রাস্তা, রেল, বিমান যোগাযোগ, নিরাপদ পরিবহন, মানসম্মত আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধার ওপর নির্ভরশীল।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে সরকার বড় প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান প্রয়োগ করতে পারে। অন্যদিকে, অস্থিরতা এই ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়নকে স্থবির করে দেয়।
বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা (কক্সবাজার, সুন্দরবন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য) অত্যন্ত সমৃদ্ধ হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই খাত পূর্ণ বিকশিত হতে পারছে না।
স্থানীয় ও বিদেশি পর্যটক: রাজনৈতিক অবরোধ, হরতাল, শাটডাউন এবং পরিবহন নিরাপত্তাহীনতার মতো পরিস্থিতিতে স্থানীয় পর্যটক চলাচল কমে যায়। বিদেশি পর্যটকের বাংলাদেশ ভ্রমণের হার তো প্রশ্নই আসে না।
নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব: রাজনৈতিক স্থবিরতা বা অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নীতির ধারাবাহিকতার অভাব আন্তর্জাতিক পর্যটকের আগমনকে কমিয়ে দেয়। যেমন, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে পর্যটকের সংখ্যা ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল।
গবেষক লিন্ডা কে. রিখটার (Linda K. Richter) পর্যটনকে ‘রাজনৈতিক হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে বলেন, “রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নীতি পরিবর্তন, নেতৃত্ব পরিবর্তন—সবকিছুই পর্যটনকে সরাসরি প্রভাবিত করে; কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা দুর্বল হলে পর্যটনও দুর্বল হয়।”
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় পর্যটন সবচেয়ে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, সঠিক নীতিতে দ্রুত পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন: দ্রুত সরকারি সহায়তা নীতি বাস্তবায়ন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা। গণমাধ্যমে ইতিবাচক বার্তা প্রচার ও ব্র্যান্ডিং। বিনিয়োগে প্রণোদনা প্রদান।
রুয়ান্ডা, ভিয়েতনাম এবং দুবাইয়ের মতো দেশগুলো শক্তিশালী ও স্থিতিশীল প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে সংকট-পরবর্তী সময়ে দ্রুত পুনরুদ্ধার করে সফল পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পর্যটন শিল্পের প্রাণশক্তি। নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, ব্র্যান্ডিং, এবং অর্থনীতি—এই সবগুলো উপাদানই একটি দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই টেকসই পর্যটন উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
