চিকিৎসক হিসেবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, কিছু শারীরিক অসুবিধা এবং জীবনযাত্রার বদভ্যাসকে গুরুত্ব না দেওয়াই অধিকাংশ স্বাস্থ্য সমস্যার, বিশেষত শীতকালীন রোগগুলোর, তীব্রতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। শীতকাল উৎসবের পাশাপাশি রোগেরও একটি মৌসুম, যদি সামান্য কিছু বিষয়ে সচেতনতা বজায় না রাখা হয়।
রোগীরা প্রায়শই কিছু প্রাথমিক লক্ষণ বা পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করেন, যা পরবর্তীতে জটিল স্বাস্থ্য সমস্যার দিকে নিয়ে যায়। নিচে এমন কিছু অসতর্কতা তুলে ধরা হলো:
১. ডিহাইড্রেশন (পানিশূন্যতা): গরমকালে সবাই পর্যাপ্ত পানি পান করলেও, শীতকালে ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে পানির তৃষ্ণা কমে যায়। কিন্তু শুষ্ক আবহাওয়ায় শরীর ভেতর থেকে দ্রুত পানিশূন্য হতে থাকে। এর ফলস্বরূপ, শ্লেষ্মা বা কফ ঘন হয়ে যায়, যা শ্বাসতন্ত্রে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি এবং বাসা বাঁধাকে সহজ করে তোলে।
২. দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও অপর্যাপ্ত ঘুম: কাজ বা দুশ্চিন্তার কারণে অনেকেই পর্যাপ্ত ঘুমের গুরুত্ব দেন না। কম ঘুম বা অতিরিক্ত ক্লান্তি সরাসরি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune System) দুর্বল করে দেয়। ফলে শরীর সাধারণ ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি হারায়।
৩. অপরিচ্ছন্নতা ও নিয়মিত হাত না ধোয়া: ঠান্ডা লাগার ভয়ে বা আলস্যের কারণে অনেকে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখেন না। ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া দ্রুত পরিবেশ থেকে হাতে এবং সেখান থেকে চোখ, মুখ বা শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটায়।
৪. পুরনো অ্যালার্জি বা অ্যাজমাকে উপেক্ষা: যাদের আগে থেকেই অ্যালার্জি বা হাঁপানির প্রবণতা আছে, তারা শীতকালে প্রথম দিকে দেখা দেওয়া হালকা লক্ষণগুলো (হাঁচি, হালকা কাশি) উপেক্ষা করেন। শুষ্ক ও ঠান্ডা বাতাস এসব উপসর্গকে দ্রুত গুরুতর করে তোলে এবং অ্যাজমার তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়।
৫. খাদ্যগ্রহণে অসাবধানতা: শীতকালে রাস্তার অস্বাস্থ্যকর খাবার বা অতিরিক্ত ঠান্ডা পানীয় গ্রহণে অসতর্কতা গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ইনফেকশন বা তীব্র গলা ব্যথার কারণ হতে পারে।
এই অসতর্কতাগুলোর কারণে শীতকালে নিম্নলিখিত সাধারণ রোগগুলো মারাত্মক আকার ধারণ করে: শ্বাসতন্ত্রের রোগ: সাধারণ সর্দি-কাশি (Common Cold), ইনফ্লুয়েঞ্জা (Flu), নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস এবং অ্যাজমার তীব্রতা বৃদ্ধি। ত্বকের সমস্যা: ঠোঁট ফাটা, ত্বক শুষ্ক হয়ে একজিমা (Eczema), ফাংগাল ইনফেকশন বা ছত্রাক সংক্রমণ।
গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা: রোটাভাইরাস বা নোরোভাইরাসের সংক্রমণ (তীব্র পেট খারাপ, বমি) ঠান্ডা আবহাওয়ায় বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়াও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ব্যথা বৃদ্ধি এবং সাইনাসের সমস্যাও প্রকট হয়।
শীতকালে শ্বাসকষ্টের রোগী অনেক বেড়ে যায়। শ্বাসকষ্ট মূলত হয় ফুসফুসে বাতাস প্রবেশের পথ সঙ্কুচিত হলে বা ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে গেলে। এর প্রধান কারণগুলো হলো: শ্বাসপথের প্রদাহ: ঠান্ডা বা শুষ্ক বাতাস শ্বাসনালীতে প্রদাহ (Inflammation) সৃষ্টি করে, যার ফলে ব্রঙ্কিয়াল টিউবগুলো সরু হয়ে যায়।
শ্লেষ্মার আধিক্য: সংক্রমণ বা ঠান্ডার কারণে ফুসফুস ও শ্বাসনালীতে অতিরিক্ত ঘন কফ বা শ্লেষ্মা তৈরি হয়, যা বাতাস চলাচলে গুরুতর বাধা সৃষ্টি করে। স্প্যাজম: অ্যাজমা রোগীদের ক্ষেত্রে ঠান্ডা বা অ্যালার্জেনের সংস্পর্শে শ্বাসনালীর পেশিতে আকস্মিক সংকোচন বা স্প্যাজম হয়, যা শ্বাসপথকে প্রায় বন্ধ করে দেয়।
শ্বাসকষ্টের ঝুঁকিতে থাকা মানুষজন হলেন: বৃদ্ধ ও শিশু (তুলনামূলক দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা), অ্যাজমা ও সিওপিডি (COPD) রোগী, ধূমপায়ীরা এবং ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা।
এই রোগগুলোর তীব্রতা কমাতে এবং জীবন বাঁচাতে নিম্নলিখিত প্রতিরোধ কৌশলগুলো মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি: ১. পর্যাপ্ত উষ্ণ তরল পান: ঠান্ডা লাগলেও দিনে পর্যাপ্ত পরিমাণে গরম জল বা উষ্ণ তরল (আদা চা, স্যুপ) পান করে শরীরকে হাইড্রেটেড রাখুন। ২. স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন: নিয়মিত এবং ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন (কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে) এবং ভিড়ের জায়গায় মাস্ক ব্যবহার করুন।
৩. সঠিক পোশাক: বাইরে বের হওয়ার সময় কান, মাথা ও বুক উষ্ণ পোশাকে ঢেকে রাখুন। সরাসরি ঠান্ডা হাওয়া লাগানো থেকে বিরত থাকুন। ৪. টিকা গ্রহণ: ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা (Flu Shot) গ্রহণ করুন, বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য এটি অপরিহার্য। ৫. অ্যালার্জেন নিয়ন্ত্রণ: বাড়ির ভেতর ধুলো, মাইট এবং অ্যালার্জেনমুক্ত রাখুন। ঘরের তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রাখুন।
৬. সঠিক চিকিৎসা: সামান্য অসুস্থতায় নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। ভাইরাল সংক্রমণের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উচিত নয়। ৭. জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন: পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম ও সুষম পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ করে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ান।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং ছোট অসুস্থতাতেও সতর্ক হয়ে আমরা শীতকালীন ও অন্যান্য গুরুতর রোগ থেকে নিজেদের এবং পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে পারি।
