আসন্ন ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তনে একগুচ্ছ বৈপ্লবিক ও সাহসী সুপারিশ পেশ করেছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আগামী সরকারের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ‘নাগরিক ইশতেহার’ উপস্থাপন করা হয়।
এই সুপারিশমালার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো দেশের দারিদ্র্যপীড়িত ১৪৭ লাখ পরিবারকে প্রতি মাসে ৪ হাজার ৫৪০ টাকা করে নিশ্চিত আয় বা ‘গ্যারান্টিযুক্ত আয়’ প্রদানের প্রস্তাব। এছাড়াও যুবকদের জন্য ক্রেডিট কার্ড এবং প্রতিটি পরিবারের জন্য এক লাখ টাকা মূল্যমানের স্বাস্থ্য কার্ডের মতো জনবান্ধব কর্মসূচির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ডক্টর দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। জাতীয় নির্বাচন ২০২৬-কে কেন্দ্র করে নাগরিক আকাঙ্ক্ষা ও কণ্ঠস্বরকে জোরালো করার উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের ৮টি বিভাগীয় শহর এবং ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় দেড় হাজার তরুণ ও নাগরিকদের মতামতের ভিত্তিতে এই বিস্তারিত ইশতেহারটি তৈরি করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সুপারিশের বিস্তারিত তুলে ধরেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি জানান, দেশের অতি দরিদ্র পরিবারগুলোর বেঁচে থাকার ন্যূনতম চাহিদার অন্তত ২৫ শতাংশ মেটানোর লক্ষ্যে এই ৪ হাজার ৫৪০ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি কোনো গণহারে প্রদান নয়, বরং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিকভাবে প্রদানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় তিনটি ধাপের কথা বলা হয়েছে: ১. প্রথম ধাপে: খানা জরিপ অনুযায়ী অতি দারিদ্র্যপ্রবণ ১১টি জেলার ২৮ লাখ মানুষকে এই সুবিধার আওতায় আনা। ২. দ্বিতীয় ধাপে: দারিদ্র্যপীড়িত ৩৬টি জেলার ৮০ লাখ মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা। ৩. চূড়ান্ত ধাপে: সারা দেশের ১৪৭ লাখ পরিবারকে এই মাসিক অর্থ সহায়তার আওতায় আনা হবে।
তৌফিকুল ইসলাম খান আরও উল্লেখ করেন যে, এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থানের জন্য বর্তমানে প্রচলিত ১৪০টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে অপ্রয়োজনীয় বা কম গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে ব্যয় কমিয়ে এই প্রকল্পে ব্যবহার করা যেতে পারে। ৩৬টি জেলার জন্য ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে এই প্রকল্পে বার্ষিক প্রায় ৪০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা খরচের প্রাক্কলন করা হয়েছে।
দারিদ্র্য বিমোচনের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের আমূল পরিবর্তনেও বিশেষ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নাগরিক প্ল্যাটফর্মের মতে, প্রতিটি পরিবারের জন্য এক লাখ টাকা মূল্যমানের একটি ‘জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ড’ থাকা আবশ্যক। এই কার্ড ব্যবহার করে নাগরিকরা সরকারি ও বেসরকারি উভয় হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ওষুধ কেনার সুবিধা পাবেন। প্রথম পর্যায়ে বয়স্ক ভাতা পাওয়া ৬১ লাখ মানুষকে এই সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে বার্ষিক সর্বোচ্চ ৬১ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে।
তরুণ প্রজন্মের ক্ষমতায়নে ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘যুব ক্রেডিট কার্ড’ চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবকরা ফেরতযোগ্য এক লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন, যা ফ্রিল্যান্সিং বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হওয়ার পথে তাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম (যেমন ল্যাপটপ বা কারিগরি যন্ত্রপাতি) ক্রয়ে ব্যয় করতে পারবেন। এর জন্য প্রাথমিক বাজেট প্রাক্কলন করা হয়েছে মাত্র ১৩৪ কোটি টাকা।
স্কুল থেকে ঝরে পড়া রোধ এবং শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক বেলা খাবার (মিড-ডে মিল) চালুর সুপারিশ করেছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। শুরুতে ৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা বাজেটে এটি শুরু করে পরবর্তীতে দেশব্যাপী সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া কৃষকদের জন্য ‘স্মার্ট কার্ড’ প্রবর্তনের মাধ্যমে কৃষি ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছানোর দাবি জানানো হয়েছে।
ডক্টর দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তার সমাপনী বক্তব্যে বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কেবল রাজনৈতিক দল নয়, বরং সাধারণ নাগরিক ও যুবকদের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন থাকা জরুরি। এই সুপারিশগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা দেশের টেকসই উন্নয়নে বড় ভূমিকা পালন করবে। তিনি আরও যোগ করেন যে, সামাজিক সুরক্ষা খাতে এই বিশাল ব্যয়কে কেবল খরচ হিসেবে না দেখে মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
আগামী সরকারের জন্য পেশকৃত এই ইশতেহারে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তাদের জন্য সরাসরি সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আসল চাবিকাঠি।
